গল্প

বাসার খোঁজে ঝিলিক মাকড়সা

farhana manna
ফারহানা মান্নান

ঝিলিক মাকড়সা ঠিক করেছে—এবার বর্ষাকালটা আর গাছে নয়, মানুষের বাড়িতে কাটাবে। গাছে থাকা ভারি ঝামেলার! এই বৃষ্টি। এই ঝড়। এই ডাল দুলছে। এই জাল ছিঁড়ছে। কতবার আর বাসা মেরামত করা যায়!

ঝিলিক বিরক্ত হয়ে বলল, ‘উফ! বাসা সারতেই যদি সারাদিন চলে যায়, গবেষণা করব কখন?’

তাই সিদ্ধান্ত পাকা। মানুষের বাড়িতে একটা শান্ত, নিরিবিলি কোনো জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু বললেই তো হলো না! আগে দেখতে হবে কোন বাড়ি ভালো, কোন বাড়িতে বেশি ঝামেলা। মানুষের জীবনযাপন ও আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

বাব্বাহ! কম হ্যাপা!

তবে ‘পর্যবেক্ষণ’ কথাটা মনে হতেই ঝিলিকের চোখ চকচক করে ওঠে। নতুন কিছু দেখবে! নতুন কিছু জানবে! তারপর সব যাচাই-বাছাই করে বেছে নেবে বর্ষাকালের নতুন ঠিকানা।

এই অভিযানের একটা নামও দিয়ে ফেলল সে, ‘ঝিলিকের ঘর-ঘর অভিযান!’

অভিযানের জন্য একটা ব্যাগও তৈরি। নিজের জাল দিয়ে বানানো ব্যাগে ঢুকল ম্যাগনিফাইং গ্লাস, বাইনোকুলার আর পাতা মুড়িয়ে বানানো টিফিনবক্স। টিফিনবক্সে কয়েকটা টসটসে পোকা। সকালেই ধরে রেখেছে ঝিলিক। কী যে রসালো দেখতে! পোকাগুলোর দিকে তাকাতেই ঝিলিকের জিভে পানি টলটল করে ওঠে।

মনে মনে বলল, ‘না, না! এখন খাওয়া যাবে না। অভিযানের মাঝে ক্ষুধা পেলে কী খাব?’

বাইনোকুলারটা বানাতে অবশ্য তাকে বেশ ভোরে উঠতে হয়েছে। শুকনো ঘাসের দুটো ফাঁপা কাণ্ড পাশাপাশি রেখে জাল দিয়ে শক্ত করে বেঁধেছে। সামনে শিশিরবিন্দু নিয়ে করেছে কত পরীক্ষা-নিরীক্ষা! সব প্রস্তুত দেখে ঝিলিকের আনন্দ আর ধরে না।

খুশিতে মুখে মুখেই একটা ছড়া বানিয়ে ফেলল—

ঝিলিক ঝিলিক ঝিলিক,
নাচবে তিড়িক তিড়িক।
ঘুরবে বাড়ি বাড়ি,
বাঁধবে বাসা ভারি!

ছড়া শেষ করে ঝিলিক নিজেই মুগ্ধ। ‘বাপরে! আমি চাইলে শুধু গবেষক নয়, ছড়াকারও হতে পারি।’

তারপর ব্যাগটা পিঠে ঝুলিয়ে আট পায়ে তিড়িংবিড়িং করতে করতে রওনা হলো প্রথম বাড়ির দিকে। লাল ইটের বাড়ি। ওই বাড়িতে টিটু নামে একটা ছোট্ট মানুষ থাকে। ঝিলিক আগেও দূর থেকে তাকে দেখেছে। সারাদিন তার সে কী দৌড়ঝাঁপ! তবু এই বাড়িটাই সবার আগে দেখতে চায় সে। ঝিলিকের হিসাব খুব পরিষ্কার, ছোট মানুষ আছে মানে খেলনা আছে। খেলনা আছে মানে লুকানোর জায়গাও নিশ্চয়ই আছে!

ঝিলিক বাইনোকুলারটা চোখে তুলল। ‘হুমম... দেখা যাক, মানুষের এই বাসা মাকড়সার বাসা হওয়ার পরীক্ষায় পাশ করে কি না!’

কিছুক্ষণ দেখেই বিরক্ত হয়ে বলল, ‘নারে না! এত দূর থেকে কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না!’

আট পায়ে গুটি গুটি ছন্দে হেঁটে বারান্দা দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল ঝিলিক। হঠাৎ—আআআআআহ্!

মানুষের চিৎকারে ঝিলিকের পিণ্ডি চমকে ওঠে! কোনো দিকে না তাকিয়ে কার্নিশ বেয়ে দ্রুত সিলিংয়ে উঠে হাঁফ ছাড়ল। তারপর আবার বাইনোকুলার বের করল। ‘দেখা দরকার... মানুষ চিৎকার করল কেন?’

ছোট মানুষটা পায়ের দিকে দেখিয়ে তার মাকে কী যেন বোঝাচ্ছে। হুমম... ঝিলিকের গায়ের সঙ্গে ওর পা লেগেছে! তাই এত কাণ্ড। ‘আরে বাবা! আমি একটা ছোট্ট মাকড়সা, আর তুমি কত বড়! আমাকে দেখে ভয় পেলে চলে?’

ঝিলিক বুঝল, কিছুক্ষণ ঘাপটি মেরে থাকাই ভালো। বাইনোকুলার হাতে পর্যবেক্ষণ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, টেরই পেল না। ঘুম ভাঙতেই ধড়মড় করে উঠল। ‘যাহ! এ কী হলো?’

এ কী হলো কাণ্ড,
ঝিলিক ঘুমে ক্লান্ত,
বাসা খোঁজা বন্ধ,
গবেষণা পণ্ড!

ছড়া আওড়াতে আওড়াতে টিফিনবক্স খুলে খাবার খেল ঝিলিক। তারপর সিলিং ধরে এগিয়ে চলল ছোট মানুষটার ঘরের দিকে। কিন্তু ঘর কি একটা যে সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে? ‘আচ্ছা, মানুষের থাকতে এত ঘর লাগে?’

ঠুনঠুন শব্দ শুনে সেদিকে এগোতেই দেখল, ঘরে আগুন! ভয় পেল ঝিলিক। ‘ঘরে আবার আগুন কেনরে বাবা?’

বাইনোকুলার বের করে দেখল, লম্বা লাঠির মতো কী একটা দিয়ে নাড়াচাড়া করা হচ্ছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই ধোঁয়ায় বাইনোকুলার ঝাপসা। ঝিলিকেরও খুকখুক কাশি শুরু হলো। ‘ও মা! মানুষ এত কষ্ট করে খায়!’

তারপর ঘর আবার পালাল। কোন ঘরে যাওয়া যায় ভাবছে, এমন সময় শুনল—ঝমঝম! ঝপঝপ! অনেকটা বৃষ্টির মতো শব্দ। দূরবীন দিয়ে দেখে, ছোট মানুষটাকে একটা বড় মানুষ গোসল করিয়ে দিচ্ছে। ‘হে হে, গোসল আবার করিয়ে দিতে হয়? আচ্ছা, এই মানুষগুলো এত সময় নিয়ে কেন বড় হয়!’

ঝিলিক বেশ মজা নিয়ে গোসল দেখল। কী মজা! এরা চাইলেই বাড়িতে বৃষ্টি নামাতে পারে! ‘আচ্ছা, এমন একটা কিছু আমি বানিয়ে ফেলতে পারি না? কী কী লাগতে পারে?’ ভাবতে ভাবতেই মানুষগুলো অন্য ঘরে চলে গেল। ঝিলিকও পিছু পিছু। ‘ইশ! কী সুঘ্রাণ!’

ছোট মানুষের গায়ে কী যেন মাখানো হচ্ছে। বাইনোকুলার দিয়ে দেখল, একটা কৌটা ঝাঁকিয়ে কী যেন বের করা হচ্ছে। ‘আচ্ছা, এটা মাখলে কী হয়? শুধু গন্ধের জন্য, নাকি অন্য কারণও আছে?’ ভাবতে ভাবতে চারপাশে তাকিয়ে ঝিলিকের চোখ ছানাবড়া। কত কত খেলনা! এত খেলনা সে একসঙ্গে কখনো দেখেনি।

ছোট মানুষের খেলনার মধ্যে তার বানানো বাইনোকুলারের মতো একটা জিনিসও আছে। তবে ওটা অনেক বড়, দেখতেও ভারী। আরও দেখল, ছোট ছোট টুকরো জোড়া দিয়ে একটা ঘর বানানো। ‘বাহ! ঘরটা তো বেশ! এমন ঘর কি আমার থাকার জন্য ভালো হবে?’

ভাবতে না ভাবতেই ছোট মানুষ টুকটুক করে ঘরটা খুলল! ‘যাহ! এটা কী হলো?’

ঠুস! কী যেন গায়ে লাগল। দূরবীন দিয়ে দেখে ঝিলিক আঁতকে উঠল। ‘ওরে বাবা! এ কী, পিস্তল না কি?’

ছোট মানুষটা তার দিকেই তাক করে গুলি করছে! ‘পালাই!’

ঝিলিক ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ির গা বেয়ে উঠে গেল ছাদে। হাঁপাতে হাঁপাতে ভাবল—

ছোট্ট একটা ঝিলিক,
করছি তিড়িক-বিড়িক,
খুঁজতে গিয়ে ঘর,
হ্যাপা হচ্ছে বিস্তর!

কিছুক্ষণ জিরিয়ে তাকাল চারপাশে। খোলা ছাদ। এক পাশে মাটি থেকে বেড়ে ওঠা গাছগুলো ছাদের একটা অংশজুড়ে ছড়িয়ে আছে। পাশেই ছোট্ট একটা ঘর। দরজায় মরচেধরা তালা। দরজার তলা দিয়ে ভিতরে গেল ঝিলিক। ঢুকেই তাজ্জব! কত কী দিয়ে যে ঠাসা! আহা! কী ঠাণ্ডা ঘর!

ওই তো দেরাজের কোণ ঘেঁষে সুন্দর একটা বাসা বানানো যাবে। আর বর্ষা শেষ হলে পাশের গাছ তো আছেই! দিনের আলো আছে। পোকা ধরার সুযোগ আছে। রাতের আরাম আছে। গবেষণার কত জিনিস আছে। ‘উফ! এখানে তো সবই আছে। আর কী চাই?’

আনন্দে মেঝেতে এক পাক ঘুরে ঝিলিক দেরাজের কোণে জাল বুনতে শুরু করে।

দেখ দেখ ঝিলিক,
বুনছে বাসা ঠিক।
টাপুরটুপুর ছন্দে
বর্ষা কাটবে আনন্দে!