রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার আগে সতর্কবার্তা দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ: রয়টার্স

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ধারাবাহিক এসব হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া বন্ধ রেখেছিল সৌদি আরব। এতে দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষ ও দর্শনার্থীদের সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যেও সৌদি আরব দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। 
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, সেই চেষ্টা থেকেই হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা বন্ধ রাখা হতে পারে। তবে এতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সৌদি গবেষক সুলতান আলামের রয়টার্সকে বলেন, সৌদি সরকার একদিকে সামরিক অভিযান চালাতে চায়, অন্যদিকে দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা ধরে রাখতে চায়।

সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে থাকে। তবে কেন বিমানবন্দরে হামলার আগে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি কর্তৃপক্ষ বা সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর।

সতর্কবার্তা বন্ধ ছিল কেন

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় সব দেশই ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। তবে হামলার আগে মানুষকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে দেশগুলোর নীতি এক নয়।

কাতার প্রায় প্রতিটি হামলার আগে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা দিয়েছে। সর্বশেষ জুলাইয়ের হামলার সময়ও বাসিন্দাদের ঘরে থাকতে ও জানালা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাহরাইন ও কুয়েতও সাইরেন বাজিয়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলেছে।

সৌদি আরব গত মে মাসে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া শুরু করে। কিন্তু গত সপ্তাহের হামলার আগে হুতিদের আক্রমণ বাড়লেও সতর্কবার্তা বন্ধ হয়ে যায়।

বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের এক্স অ্যাকাউন্ট অনুযায়ী, সর্বশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশের জন্য।

তবে বৃষ্টি, বন্যা ও খারাপ আবহাওয়া নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া বন্ধ করেনি কর্তৃপক্ষ। সোমবারও এ ধরনের সতর্কতা দেওয়া হয়। একই দিন হামলা প্রতিহত করার ঘটনা ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানের ছবি, গুজব বা তথ্য প্রকাশ না করতেও মানুষকে সতর্ক করা হয়।

রয়টার্স জানিয়েছে, এসব তথ্য প্রকাশের কারণে কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত সপ্তাহের হামলার আগে সৌদি আরবের এক মিত্র পশ্চিমা দেশের কর্মকর্তারা দেশটির কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন আগাম সতর্কবার্তা বন্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন দুই কর্মকর্তার ভাষ্য, সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, সতর্কবার্তার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছিল। রাতে সতর্কবার্তার শব্দে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় অনেক নাগরিক অভিযোগ করেছিলেন।

এ বিষয়ে সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর ও কর্মকর্তারা রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেননি।

সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বলেন, হামলা সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে সৌদি সরকার। তবে সতর্কবার্তা বন্ধ রাখায় মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘হুতিদের হামলার জবাব দিতে হবে, কিন্তু তাতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হোক, সেটিও তারা চায় না। অথচ হামলার আগে সতর্কবার্তা না দেওয়ায় মানুষের মধ্যে সেই উদ্বেগই তৈরি হচ্ছে, যা তারা এড়াতে চাইছে।’

সোমবার সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ রিয়াদ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় কয়েকটি শহরে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে নতুন সতর্কবার্তা দেয়। ২৯ সেপ্টেম্বরের পর এটিই ছিল প্রথম সতর্কতা। তবে বিমানবন্দরে হামলার কারণেই সতর্কবার্তা আবার চালু করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স।

সব স্থাপনা রক্ষা করা কঠিন

সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলী শিহাবি বলেন, দেশের বিশাল আয়তনের কারণে সব স্থাপনা রক্ষা করা কঠিন। বিমানবন্দর, পাইপলাইন ও তেল স্থাপনাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা একসঙ্গে সুরক্ষিত রাখার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।

রয়টার্সকে তিনি বলেন, সৌদি আরবের সব স্থাপনা রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও হামলা প্রতিহত করার ক্ষেপণাস্ত্রও নেই।

এত হামলার মধ্যেও সোমবার রিয়াদে বিশ্ব পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের জ্বালানি সম্মেলন আয়োজন করে সৌদি আরব। তবে বড় কয়েকটি তেল কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা এতে অংশ নেননি।

সম্মেলনে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী ও যুবরাজের ভাই প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান বলেন, রিয়াদে আসার জন্য অতিথিদের ধন্যবাদ জানাচ্ছেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘আপনারা জানেন, এই দেশ নিরাপদ।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সম্মেলন আয়োজনের অর্থ এই নয় যে ঝুঁকি কেটে গেছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থেকে সৌদি আরব সরে আসবে না।

দূতাবাসের কর্মীরাও সতর্কতা পাননি

পশ্চিমা চার কর্মকর্তার দুজনের ভাষ্য, চলতি মাসে সোমবারের আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সতর্কবার্তা না দেওয়া হলেও সৌদি আরবে বেশ কয়েকবার হামলা হয়েছে।

রয়টার্সের দেখা সতর্কবার্তা এবং এ বিষয়ে অবগত তিন ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, এ সময় পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাসগুলো নিজেদের কর্মীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। এসব বার্তা যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা সরকারের গোয়েন্দা তথ্য এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল।

গত সপ্তাহে বিমানবন্দরে প্রথম দিকের দুটি হামলার সময় দূতাবাসের কর্মীরা সতর্কবার্তা পেলেও শনিবারের হামলার আগে তারাও কোনো সতর্কতা পাননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কেন ওই হামলার আগে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, তা জানতে পারেনি রয়টার্স।

গত সপ্তাহের হামলাগুলোর মধ্যে শনিবারের হামলাটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রোববার সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শনিবারের হামলার ভিডিও প্রকাশ করে। এতে বিমানবন্দরের টার্মিনালে যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কেউ বিমানে ওঠার জন্য সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন, আবার কেউ চেয়ারে বসে মোবাইল ফোন দেখছিলেন। এর মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের উজ্জ্বল কমলা আভা দেখা যায়।