হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং: অতিরিক্ত যত্ন নাকি নিয়ন্ত্রণ
প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালনের অনেক ধরণ আছে। বর্তমানে সামাজিকমাধ্যম, প্যারেন্টিং ব্লগ বা টিভি অনুষ্ঠানে প্রায়ই একটি কথা শোনা যায় ‘হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং’। কিন্তু হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং আসলে কী?
সহজভাবে বললে, হেলিকপ্টার প্যারেন্টস হলেন তারা, যারা সন্তানের ওপর খুব বেশি নজরদারি করেন বা অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে চান। এ ধরনের বাবা-মা সবসময় সন্তানের চারপাশে ঘুরঘুর করেন, এই ধারণা থেকে ‘হেলিকপ্টার’ নামটি এসেছে। ঠিক যেন মাথার ওপর সবসময় একটি হেলিকপ্টার উড়ে বেড়াচ্ছে।
এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন হাইম জিনোৎ। তিনি ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত ‘বিটুইন প্যারেন্ট অ্যান্ড টিনেজার’ বইয়ে প্রথমবার এই শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে টিভি অনুষ্ঠান ও সামাজিকমাধ্যমের কারণে শব্দটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এছাড়া ‘হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং’ থেকে আরও দুটি শব্দ এসেছে ‘লনমাওয়ার প্যারেন্ট’ ও ‘স্নোপ্লাও প্যারেন্ট’। এ ধরনের বাবা-মা কেবল সন্তানের ওপর নজর রাখেন না, বরং সন্তানের পথের সব বাধাও সরিয়ে দিতে চান। এমনকি সন্তান কলেজে চলে যাওয়ার পরও তারা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
হেলিকপ্টার প্যারেন্টিংয়ের বৈশিষ্ট্য
হেলিকপ্টার প্যারেন্টসরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে, তারা সন্তানের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি করছেন। নিচে এমন কিছু আচরণের উদাহরণ দেওয়া হলো, যা দেখলে বোঝা যেতে পারে কোনো বাবা-মা অতিরিক্ত নজরদারি করছেন কিনা।
হেলিকপ্টার প্যারেন্টসরা সন্তানের পড়ালেখা, স্কুলের কাজ বা অতিরিক্ত কার্যক্রম সবসময় নজরে রাখা। তারা সন্তানের হয়ে সিদ্ধান্ত নেন। সন্তানকে নিজে কথা বলতে উৎসাহ না দিয়ে সরাসরি শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সন্তানের যেকোনো সমস্যায় সঙ্গে সঙ্গে হস্তক্ষেপ করে সমাধান করেন।
অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তানদের জন্য কিছু নিয়ম থাকা দরকার, বিশেষ করে বড় সন্তানদের জন্য। যেমন—কখন বাসায় ফিরতে হবে, বাইরে গেলে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা বা ‘চেক ইন’ করা। আবার কিছু অভিভাবক আছেন, যারা সন্তানকে সবসময় নজরদারিতে রাখতে খুব একটা পছন্দ করেন না।
কম বয়সীদের ক্ষেত্রেও হতে পারে
হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং কেবল কিশোর বা বড় শিশুদের ক্ষেত্রেই নয়, খুব ছোট থেকেই শুরু হতে পারে।
যেমন কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে—খেলাধুলার সময় সবসময় খুব কাছ থেকে নজর রাখা। পার্কে খেলতে গিয়ে এক মুহূর্তও একা না রাখা। পড়ে যেতে পারে বা হোঁচট খেতে পারে ভেবে দৌড়াতে বা কোথাও উঠতে না দেওয়া।
এভাবে ছোট ছোট ঝুঁকি থেকেও সন্তানকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন হেলিকপ্টার প্যারেন্টসরা।
হেলিকপ্টার প্যারেন্টিংয়ের ভালো-খারাপ দিক
এই ধরনের প্যারেন্টিংয়ের সব প্রভাব খারাপ নয়। অনেক সময় এসব বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক হয়। তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন, আবেগকে গুরুত্ব দেন এবং সন্তানের কথা মন দিয়ে শোনেন।
কিন্তু এর নেতিবাচক দিকও আছে। তিন শতাধিক কলেজ শিক্ষার্থীকে নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণকারী বাবা-মায়ের সন্তানদের মানসিক সুস্থতার স্কোর তুলনামূলক কম ছিল। তারা অন্যদের তুলনায় উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার ওষুধ বেশি ব্যবহার করত।
তাহলে সহায়ক প্যারেন্টিং ও হেলিকপ্টার প্যারেন্টিংয়ের পার্থক্য কোথায়? মূল পার্থক্য হলো—পরিস্থিতি অনুযায়ী বাবা-মায়ের হস্তক্ষেপ সত্যিই প্রয়োজন কি না, এটি নির্ভর করে সন্তানের বয়স ও পরিস্থিতির ওপর। আর এই সীমারেখা ঠিক করাটা অনেক সময় বাবা-মায়ের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
কেন বাবা-মা হেলিকপ্টার প্যারেন্ট হয়ে ওঠেন
এর পেছনে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দুই ধরনের কারণই কাজ করে। প্রথমত, বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির কারণে বাবা-মা প্রতিনিয়ত নানা বিপদের খবর শুনছেন। ফলে তারা সবসময় সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন।
মাদকাসক্তি, সামাজিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এসব বিষয় বাবা-মাকে আরও উদ্বিগ্ন করে তোলে। ফলে তারা মনে করেন সন্তানের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরে রাখা জরুরি।
অবশ্য কিছু পর্যায় পর্যন্ত এটি ভালো। কিন্তু যখন যত্ন অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়, তখন সমস্যা শুরু হয়।
অনেক বাবা-মা আবার সন্তানের আচরণ ও অর্জনকে নিজের প্যারেন্টিং দক্ষতার প্রতিফলন হিসেবে দেখেন। তাই তারা সন্তানকে ‘সেরা’ বানানোর জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থতা থেকে বাঁচাতে চান।
আবেগ নিয়ন্ত্রণে প্রভাব
মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোল বি. পেরি বলেন, এ ধরনের শিশুরা বড় হওয়ার চ্যালেঞ্জ সামলাতে তুলনামূলক বেশি সমস্যায় পড়ে। স্কুলের জটিল সামাজিক পরিবেশের সঙ্গেও তারা সহজে মানিয়ে নিতে পারে না।
তিনি ৪২২ জন শিশুকে নিয়ে ৮ বছর ধরে একটি গবেষণা করেন। শিশুদের ২, ৫ ও ১০ বছর বয়সে সামাজিক ও আবেগিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়। শিক্ষক ও অভিভাবকদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, হেলিকপ্টার প্যারেন্টিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি হলো নিজের ওপর দুর্বল নিয়ন্ত্রণ। ফলে এসব শিশুরা স্কুলের পরিবেশে মানিয়ে নিতে বেশি কষ্ট পায়।
পেরি বলেন, যেসব শিশু নিজের আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তারা ক্লাসে বেশি সমস্যায় পড়ে, তাদের বন্ধু বানাতে সমস্যা হয়, পড়ালেখাতেও পিছিয়ে পড়ে।
গবেষণায় বলা হয়, এসব বাবা-মায়ের উদ্দেশ্য ভালো ছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে শিশুদের আবেগিক চ্যালেঞ্জ সামলানো শেখানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কখন ভুলই ভালো
মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক সানদি মান বলেন, শিশুদের মানসিক শক্তি ও ধৈর্য গড়ে তুলতে ভুল করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বাবা-মা চাইলে শিশুদের ভুল করতে উৎসাহও দিতে পারেন।
তিনি বলেন, হোমওয়ার্ক, কোনো ক্রাফট প্রজেক্ট বা রান্না— যেকোনো কিছুতে শিশুদের নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে দিতে হবে। তাদের বুঝতে সাহায্য করতে হবে যে, ভুল থেকেই মানুষ শেখে।
তার ভাষ্য, যদি তারা কখনো চেষ্টা না করে, তাহলে কীভাবে বুঝবে কোন মসলা দিলে খাবারের স্বাদ খারাপ হয়, বা লাল রং মেশালে ঠিকঠাক রঙ পাওয়া যাবে কি না?
তিনি মন্তব্য করেন, নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই শিশু সবচেয়ে বেশি শেখে।
অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সন্তানের পাশে থাকা
হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং নয়, কিংবা একেবারে উদাসীন প্যারেন্টিং কোনোটাই পুরোপুরি ভালো নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দুটোর মাঝামাঝি একটি ভারসাম্য তৈরি করা। এজন্য নিজের মত চাপিয়ে না দিয়ে সন্তানের ভয়, উদ্বেগ ও সমস্যাগুলো মন দিয়ে শুনতে হবে। এতে সন্তান বুঝবে—প্রয়োজনে বাবা-মা পাশে আছেন, কিন্তু তার জীবন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছেন না।
যেসব বাবা-মা হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং করেন, তারা সাধারণত সন্তানের ভালোর জন্যই করেন। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা বলছে, , অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি শিশু ও কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
সূত্র:
জার্নাল অব অ্যাডোলেসেন্স, অক্টোবর ২০১২; খণ্ড ৩৫(৫)।
সোশিওলজিক্যাল স্পেকট্রাম, জুলাই ২০১১; খণ্ড ৩১(৪)।
ডেভলপমেন্টাল সাইকোলজি, আগস্ট ২০১৮; খণ্ড ৫৪(৮)।
কগনিটিভ থেরাপি অ্যান্ড রিসার্চ, আগস্ট ২০১৭; খণ্ড ৪১(৪)।
জার্নাল অব ফ্যামিলি সাইকোলজি, সেপ্টেম্বর ২০০৭; খণ্ড ২১(৩)।
জার্নাল অব চাইল্ড অ্যান্ড ফ্যামিলি স্টাডিজ-২০১৪; খণ্ড ২৩।


