বন্ধুত্ব কেন হারিয়ে যায়?

শবনম জাবীন চৌধুরী

বন্ধুত্ব, দোস্তি কিংবা ইয়ারি—জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রক্তের সম্পর্কের বাইরে এটি সবচেয়ে মজবুত ও কাছের সম্পর্কগুলোর অন্যতম। অক্সিজেন ছাড়া যেমন নিঃশ্বাসের ছন্দপতন ঘটে, ঠিক তেমনি বন্ধু ছাড়া আমাদের জীবনও গতি হারায়।

বন্ধু সবসময় ছায়াসঙ্গীর মতো আমাদের পাশে থাকে। বন্ধু যেন আমাদের জীবনের একটি আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের প্রকৃত প্রতিবিম্ব দেখতে পাই। তারা আমাদের সঠিক পরামর্শ দেয় এবং নিজেকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। আমাদের অভ্যাস, দুর্বলতা ও পারদর্শিতার বিষয়গুলো বন্ধুরা খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে, যা অনেক সময় আমাদের নিজেরই দৃষ্টিগোচর হয় না। জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলো আমাদের বাস্তবতার মাটিতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে এবং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন করে তোলে।

বন্ধু ছাড়া যেন এক মুহূর্তের জন্যও জীবন কল্পনা করা যায় না। যদি কখনো আমরা আমাদের বন্ধুদের হারিয়ে ফেলি, তবে জীবন চলার নৌকাটি যেন দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। আত্মগ্লানিতে ভুগতে হয়, এমনকি চারপাশের সবকিছুই ধীরে ধীরে ফিকে মনে হতে শুরু করে।

হঠাৎ করেই যদি কোনোদিন দেখেন, আপনার বন্ধুর তালিকাটি ধীরে ধীরে ছোট হতে শুরু করেছে, তবে নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘কেন?’। চলুন, আপনার ভাবনার সঙ্গে নিচের কারণগুলো মিলিয়ে দেখা যাক। হয়তো কারণ ও সমাধান, দুটোই এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে।

অবহেলা

আমরা অনেক সময় বন্ধুদের অবহেলা করে থাকি। কীভাবে? তাদের মেসেজের রিপ্লাই না দেওয়া, ফোন করলে সময়মতো সাড়া না দেওয়া, ছোট ছোট বিষয়ে অভিমান করা কিংবা মনের মধ্যে রাগ পুষে রাখা—এসব কাজ আমরা প্রায়ই করে থাকি। আর মনে করি, ‘ও তো আমার বন্ধু, ও তো আছেই, থাকবে।’ কিন্তু দিনের পর দিন এই আচরণগুলোই ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের বন্ধনকে দুর্বল করে তোলে।

কর্মব্যস্ততা

অফিসের ব্যস্ততা, ইমেইল আর মিটিংয়ের ভিড়ে আপনি হয়তো নিজের অজান্তেই বন্ধুত্বের সম্পর্কটিকে ফিকে করে ফেলছেন। যে কর্মব্যস্ততার কারণে আপনি বন্ধুদের হারাতে বসেছেন, একসময় বন্ধুহীন হয়ে পড়লে সেই কর্মব্যস্ততাও আপনার কাছে বোঝা মনে হতে পারে।

বন্ধুত্ব মানেই কি শুধুই আড্ডা দেওয়া বা কিছু সময় একসঙ্গে কাটানো? মোটেও তা নয়। একজন বন্ধু অভিভাবকের মতো কর্মজীবনের নানা বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ দিতে পারে, যা আপনার টিমওয়ার্ক, দক্ষতা ও ক্যারিয়ারের সুযোগও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

স্বার্থপরতা

মানুষ স্বভাবগতভাবেই কিছুটা স্বার্থপর, কথাটি শুনতে রুঢ় লাগলেও এটাই বাস্তবতা। বিপদে এক বন্ধুর পাশে আরেক বন্ধু দাঁড়াবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সম্পর্কটি একপাক্ষিক হয়ে যায়, অর্থাৎ একজন বন্ধু সবসময় নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে অন্যজনের পাশে থাকে, অথচ অপরজনের প্রচেষ্টা বারবারই নগণ্য থাকে, তখন সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে।

পরিবর্তন

মানুষ পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই আমরা পরিণত হতে থাকি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিত্ব, অভিরুচি, অভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ধরন বদলে যায়। প্রতিটি মানুষই একে অন্যের থেকে আলাদা। তাই এই ব্যক্তিগত পরিবর্তনগুলো আপনার বন্ধু বা বন্ধুদের পছন্দ কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তখন ধীরে ধীরে একটি মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্কে ইতি টেনে দিতে পারে।

স্থানান্তর

জীবনের তাগিদে অনেক সময় আমাদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি পেরিয়ে দূরে পাড়ি জমাতে হয়। হতে পারে সেটি অন্য কোনো শহরে কিংবা দূর দেশের কোনো প্রান্তে। কাছাকাছি থাকার সময় যেখানে প্রতিদিন কর্মব্যস্ততা শেষে সন্ধ্যায় হয়তো চায়ের দোকানে নিয়মিত আড্ডা জমে উঠত, দূরে চলে যাওয়ার পর সেই সামনাসামনি যোগাযোগ অনেকটাই কমে যায়। যদিও সত্যিকারের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দূরত্ব কোনো বাধা নয়, তবু বাস্তবতায় দেখা যায়, এই দূরত্বের কারণেই অনেক বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় বা ফিকে হয়ে পড়ে।

সময় বহমান স্রোতের মতো। তাই জীবনে আশীর্বাদের মতো পাওয়া বন্ধুদের মূল্যায়ন করি, তাদের সময় দিই এবং একসঙ্গে জীবনের সেরা কিছু স্মৃতি তৈরি করি। বন্ধুত্বের যত্ন নিই। বন্ধুদের হারিয়ে একাকী ও দিশাহীন জীবন বেছে না নিয়ে, বরং প্রতিটি মুহূর্ত প্রাণোচ্ছ্বলভাবে উপভোগ করি।