হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে অনুসরণ করতে পারেন যে ৭ অভ্যাস
ব্যস্ততার কারণে আজকে সকালে হাঁটাহাঁটি করা হলো না। সারাদিন একটানা চেয়ারে বসে কাজ করতে করতেই দিন পেরিয়ে গেল। এই তো গত রোববার অফিস থেকে ফেরার পথে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে গিয়ে বেশ হাঁপাতে হচ্ছিল। আর দুপুরের খাবারটা তো প্রতিদিন বাইরেই খাওয়া হচ্ছে, হোটেলের তরকারির ওপরে তেল ভাসতে থাকা, চড়া মশলায় রান্না করা বিভিন্ন পদ দিয়ে। সন্ধ্যার নাশতায় নোনতা বা মিষ্টিজাতীয় খাবার। আর রোজ রাতে দেরি করে ঘুমানোর সেই পুরোনো অভ্যাস। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত মাঝবয়সী আরিফ হোসেনের।
আলাদাভাবে এই ছোট ছোট বিষয়গুলো আপনার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও এগুলো সম্মিলিতভাবে আপনাকে এক নীরব ঝুঁকির দিকে ক্রমেই ঠেলে দিচ্ছে। কপালে নিশ্চয়ই কিঞ্চিৎ চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল, তাই তো? নানান কাজের ভিড়ে হৃদযন্ত্রের যত্নেই যেন ঘাটতি থেকে যায়। অথচ, সহজ কিছু অভ্যাসের অনুশীলন করলেই আমরা হৃৎপিণ্ডের সুস্থতা অনেকটাই নিশ্চিত করতে পারি।
এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়েছেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. কাজী নজরুল ইসলাম।
কেন হার্টের সুস্থতা গুরুত্বপূর্ণ?
আপনার হার্ট প্রতি মুহূর্তে কাজ করে চলেছে, শরীরের প্রতিটি প্রান্তে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। একটি সুস্থ হৃৎপিণ্ড দেহের প্রতিটি অঙ্গ ও টিস্যু সঠিকভাবে কাজ করার জন্য যে পরিমাণ পুষ্টি প্রয়োজন, তা পৌঁছানোর কাজে সহায়তা করে থাকে। আপনার হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে এর নেতিবাচক প্রভাব প্রতিটি শারীরবৃত্তীয় কাজের ওপর পড়ে।
হৃদযন্ত্রের যত্ন নিলে আমরা সুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘদিন জীবন অতিবাহিত করতে পারি। দীর্ঘদিন বাঁচা মানেই কি আয়ুর সংখ্যায় আরও কয়েক বছরের সংযোজন? মোটেই তা নয়। জীবনের সময়গুলো আরও বেশি প্রাণশক্তি ও বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষিত অবস্থায় কাটানো যায়।
হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলো কী কী
মাইল্ড হার্ট অ্যাটাক থেকে শুরু করে হার্ট ফেইলিউর, হৃদরোগ নানা ধরনের হতে পারে। হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলো সম্পর্কে জানা থাকলে প্রতিরোধের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়ে যায়।
এ সম্পর্কে ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, ধূমপানের অভ্যাস, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং কায়িক পরিশ্রমের ঘাটতির মতো বিষয়গুলো হৃদরোগের ঝুঁকির প্রধান কারণ।
হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে ৭ সহজ অভ্যাস
ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ
রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে ধমনিতে চর্বির আস্তরণ পড়তে শুরু করে, যা ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, আপনার যদি ডায়াবেটিস নাও থাকে, তবুও আপনার রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়মিত চেক করা জরুরি। প্রতি তিন বছর অন্তর একবার করে চেক করা উচিত। রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ
কোলেস্টেরল, বিশেষ করে এলডিএল (ব্যাড কোলেস্টেরলও বলা হয়), রক্তে উপস্থিত অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিলে দলা বা পিণ্ডের সৃষ্টি করতে পারে, যা আমাদের হৃৎপিণ্ড ও ব্রেনে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীগুলোকে ব্লক করে দিতে পারে।
ডা. নজরুল ইসলামের মতে, আমাদের শরীরের প্রায় ২৫ শতাংশ কোলেস্টেরল আসে আমাদের গ্রহণ করা বিভিন্ন খাবার থেকে। তাই সুষম খাবার এবং নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
নিয়মিত ব্লাড প্রেশার চেক করাটা খুবই জরুরি। কারণ অনেকে হয়তো বুঝেই উঠতে পারেন না বা জানেন না যে তাদের রক্তচাপ বেশি।
ডা. নজরুল ইসলাম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাবারে লবণের পরিমাণ কমাতে ও শরীরের অতিরিক্ত মেদ ও ওজন কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়াও, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি ওষুধ সেবনের কথাও বলেছেন।
ধূমপান ত্যাগ
ধূমপান আমাদের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, এটা আমাদের কারোরই অজানা নয়। শরীরের প্রতিটি কোষ থেকে শুরু করে হৃৎপিণ্ড খুবই অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়। ধূমপান ছেড়ে দিলে শরীর নিজে থেকেই পুনরায় সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। তাই ধূমপান এড়িয়ে চলতে হবে এবং যারা ধূমপান করে থাকেন, তাদের দ্রুত এই বদভ্যাস ছাড়তে হবে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ
ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) উচ্চতার সঙ্গে শরীরের ওজনের তুলনা করে আমাদের ওজন স্বাস্থ্যসম্মত রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করে। বিএমআই ২৫-এর নিচে রাখতে পারলে তা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
কায়িক পরিশ্রম
যারা নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করেন, তারা অন্যদের তুলনায় সুস্থ এবং দীর্ঘায়ু লাভ করে থাকেন। যে কাজটি আপনার করতে ভালো লাগে, হতে পারে হাঁটাহাঁটি, সাইকেল চালানো বা ব্যায়াম করার মাধ্যমে আপনি নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করতে পারেন। এই প্রত্যেকটি কাজই আপনার হার্টকে ভালো রাখতে সাহায্য করবে। তাই প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত।
স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস
চিকিৎসকের মতে, হৃদযন্ত্রের সুস্থতায় খাদ্যতালিকায় তাজা ফল ও শাকসবজি, দানাদার শস্য, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ মাছ, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার অবশ্যই রাখতে হবে। আর প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত লবণ, ভাজাপোড়া খাবার এবং লাল মাংসের পরিমাণ কমিয়ে ফেলতে হবে বা সম্ভব হলে এগুলো খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত?
চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বা হাসপাতালে গিয়ে অনেকগুলো টেস্ট করানো কারও জন্যই সুখকর কোনো বিষয় নয়। কিন্তু যখন হৃদযন্ত্রের সুস্থতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন আসে, তখন প্রসঙ্গটা কিছুটা ভিন্ন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হার্টের বিভিন্ন টেস্ট করালে পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার আগেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে চিকিৎসা শুরু করে দেওয়া যায়। অতীতে পরিবারের কারও হৃদরোগের জটিলতা থাকলে, প্রত্যেক সদস্যের নিয়মিত চেক-আপ করানো খুবই জরুরি।
আপনার যদি কখনো বুকে ব্যথা, শ্বাস নিতে কষ্ট বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন হতে থাকে, তাহলে অপেক্ষা না করে দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।





