‘আমি যেতে চাই না, এই মাঠ ছাড়তে চাই না’

স্পোর্টস ডেস্ক

ম্যাচ শেষ হয়েছে। জয় এসেছে। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য শেষ হয়েছে আরও বড় কিছু। ২১ বছরের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়। বেনিনকে ৩-০ গোলে হারানোর পর মনুমেন্তালের মাইক্রোফোন হাতে যখন দাঁড়ালেন লিওনেল মেসি, তখন তার সামনে ছিল ৮৫ হাজার মানুষ। পেছনে ছিল অগণিত স্মৃতি। আর সামনে ছিল এমন এক বিদায়, যেটি তিনি নিজেও চাননি।

কথা বলতে গিয়েই বোঝা গেল, কতটা কঠিন সেই মুহূর্ত। মেসির কণ্ঠে বারবার ফিরে এল সতীর্থ, পরিবার, শিরোপা, ব্যর্থতা আর আর্জেন্টিনার জার্সি। সবচেয়ে বেশি ফিরে এল একটি কথাই, এই দল থেকে দূরে সরে যাওয়া তার জন্য কতটা কষ্টের।

'আজ কিছু বলাটা কঠিন। এত আবেগ, এত কিছু একসঙ্গে মাথায় ঘুরছে। সবার আগে আমার বাবার কথা মনে পড়ছে। আমি শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, যেমনটা আমার বিদায়ী চিঠিতেও বলেছিলাম,' বলতে থাকেন মেসি।

এরপর ফিরে দেখলেন জাতীয় দলের হয়ে দুই দশকের বেশি সময়ের পথচলা। যে পথ সব সময় মসৃণ ছিল না, ছিল ব্যর্থতা, সমালোচনা আর হতাশাও। কিন্তু মেসি বললেন, '২০ বছরেরও বেশি সময় এই জার্সি পরতে পারা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের ছিল। আমরা সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়ও আমি কখনো লড়াই থামাইনি, নিজের সবটুকু দেওয়া থামাইনি, কখনো দলের পাশে থাকা বন্ধ করিনি।'

তারপরই আসে সেই বাক্য, যা পুরো মনুমেন্তালকে যেন আরও নীরব করে দেয়। 'ফিরে না আসাটা অনেক কষ্টের হবে। আমি শপথ করে বলছি, সারাজীবন এখানে ফিরে আসতে চাইব। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর বিষয়।'

তাহলে কেন থামছেন? মেসির উত্তরেও ছিল দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি এবং সঠিক সময়ের উপলব্ধি।

'আমি সারাজীবন এখানে থাকতে চাই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এটাই সঠিক সময়। শেষ বিশ্বকাপটা আমার জন্য অনেক বেশি কঠিন ছিল। আমরা আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, খুব কাছেও গিয়েছিলাম। সত্যি বলতে, অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনি। আমরা আমাদের সবটুকু দিয়েছিলাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা শারীরিক ও মানসিক, দুই দিক থেকেই আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন ছিল। সত্যি বলতে, আমরা কোনোমতে টিকে ছিলাম।'

শেষ পর্যন্ত হার না মানার সেই মানসিকতাটাই ছিল মেসির বক্তব্যের অন্যতম বড় অংশ। নিজের সঙ্গে যারা এত বছর এই জার্সি ভাগ করেছেন, তাদের প্রতিও অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, 'আমরা সব সময়ের মতোই লড়াই করেছি। এই জার্সির জন্য, যেসব সতীর্থের সঙ্গে আমি খেলেছি, তাদের সঙ্গে মিলে সবটুকু দিয়েছি। আমার পাশে যে সতীর্থই ছিল, বিশ্বাস করুন, তারা সবাই এই জার্সির জন্য নিজেদের সর্বস্ব দিয়েছে।'

শৈশবের যে স্বপ্ন নিয়ে ফুটবল শুরু করেছিলেন, জাতীয় দলের সতীর্থরা সেটি পূরণ করতে তাকে সাহায্য করেছেন, এ কথা বলতে গিয়ে গভীর কৃতজ্ঞতা ফুটে ওঠে মেসির কণ্ঠে, 'এই দলের সঙ্গে যে সময়টা কাটিয়েছি, তার জন্য আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ দিতে চাই। তারা আমাকে ছোটবেলার সেই স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করেছে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া, আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন হওয়া, ফাইনালিসিমার চ্যাম্পিয়ন হওয়া, আমরা যে প্রতিযোগিতায় খেলেছি, সেসবের চ্যাম্পিয়ন হওয়া।'

'মাঠে এবং মাঠের বাইরে তাদের সঙ্গে সময় কাটানো আমার জন্য ছিল বিশাল সম্মানের। আমি যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করতে প্রস্তুত থাকতাম, কারণ জানতাম, আমার পাশে এমন কিছু যোদ্ধা আছে যারা নিজেদের সবটুকু দিয়ে লড়বে,' বলেন এই কিংবদন্তি।

আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে গিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটেছেন মেসি। শহর বদলেছে, স্টেডিয়াম বদলেছে, প্রতিপক্ষ বদলেছে; বদলায়নি মানুষের ভালোবাসা। সেই স্মৃতিও বিদায়ের রাতে মনে পড়েছে তার, 'এখানে খেলা আমি ভীষণ মিস করব। আমি সৌভাগ্যবান যে পুরো দেশ ঘুরে খেলার সুযোগ পেয়েছি এবং প্রতিবারই মানুষের কাছ থেকে অসাধারণ ভালোবাসা পেয়েছি। যা কিছু পেয়েছি, তার জন্য আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ।'

মেসি আরও বলেন, 'এত বছর ধরে আমি যেখানে গিয়েছি, স্টেডিয়াম সব সময় পূর্ণ দেখেছি, ম্যাচ বিশ্বকাপের হোক, কোপা আমেরিকার হোক, যেকোনো ম্যাচই হোক। মানুষ সব জায়গায় এসেছে, অনেক কষ্ট করে এসেছে। আমরা জানি, এটা কতটা কঠিন। আর তাই আমরা সব সময় অনুভব করেছি, আমরা যেন দেশের প্রতিটি জায়গাতেই নিজেদের ঘরের মাঠে খেলছি। আমরা সত্যিই সেটা অনুভব করেছি।'

তবে মেসির স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল পাতাগুলোর একটি লেখা হয়েছিল বিশ্বকাপ জয়ের পর। সেই শিরোপা নিয়ে দেশে ফেরার পর আবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে মাঠে নামা, দিনটিকে আজও নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সুখের মুহূর্ত মনে করেন তিনি, 'আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি আমি এখানে পেয়েছি বিশ্বকাপ জেতার পর যখন আবার আমরা এখানে খেলেছিলাম। সেদিনের অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলব না। অসাধারণ ছিল। আজও আমি সেই দিনের ভিডিও দেখি এবং আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি।'

'সেই দিনটি আমার ইতিহাসে, আমার সতীর্থদের ইতিহাসে, আমার পরিবারের ইতিহাসে চিরকাল লেখা থাকবে। সেটি ছিল অসাধারণ। সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।'

বিশ্বকাপজয়ের সেই আনন্দের কয়েক বছর পর মাঠে দাঁড়িয়ে এবার সম্পূর্ণ বিপরীত অনুভূতি। এবার উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু মেসি হলেও, উদযাপনের মানুষটি নিজেই জানেন, এটি তার শেষ। মেসির ভাষায়, 'আজ আবার এখানে ফিরে এসে আমি নিশ্চিতভাবেই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দুঃখের দিনটি অনুভব করছি। কারণ আজ আমি জাতীয় দল এবং আপনাদের সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি।'

তবে বিদায় মানেই দূরে সরে যাওয়া নয়। আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ পথচলায় নিজের জায়গাটা এবার গ্যালারিতে খুঁজে নিতে চান মেসি, 'জাতীয় দলের রং ধারণ করে খেলাটা আমি ভীষণ মিস করব। তবে এখন আমি ওই পাশে থাকব। আপনাদের সঙ্গেই। এই ছেলেদের এবং সামনে যা আসছে, সবকিছুকে সমর্থন করব। সব সময় একসঙ্গে থাকব।'

এখানেই থামেননি মেসি। তার কাছে আর্জেন্টিনার সাফল্যের সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল ঐক্য। তাই ভবিষ্যতের কঠিন সময়ের জন্যও রেখে গেলেন সতর্কবার্তা, 'এটা এখন অনেক বেশি প্রমাণিত যে আমরা যখন একসঙ্গে থাকি, ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন আমরা যেকোনো দলের চেয়ে শক্তিশালী এবং যেকোনো বাধা পেরিয়ে যেতে পারি। নিশ্চিতভাবেই কঠিন সময় আসবে। কারণ আমরা এই সময়ে যা অর্জন করেছি, তা স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। আর সেই কঠিন সময়ে আমাদের তাদের পাশে আরও বেশি করে দাঁড়াতে হবে।'

দলের ভেতরে ঐক্য ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সমালোচকদের নিয়েও সতর্ক করলেন মেসি, 'আমি যেমন সব সময় তাদের বলি, আমাদের শেষ আলোচনাতেও বলেছি, বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আমাদের শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল তৈরি করতে হবে। কারণ কিছু মানুষ আছে যারা জাতীয় দলকে ব্যর্থ দেখতে চায়। আমরা তাদের সেই আনন্দ দিতে পারি না।'

কঠিন সময়ই যে একটি দলের আসল পরিচয় সামনে আনে, সেটিও মনে করিয়ে দিলেন আর্জেন্টিনার সদ্য সাবেক অধিনায়ক, 'কঠিন সময়, খারাপ সময়, এসব সময়েই বোঝা যায় একটি দল আসলে কী দিয়ে তৈরি। যখন একটি শক্তিশালী দল থাকে না, তখন কোনো কিছু অর্জন করা খুব কঠিন। আর আমি আপনাদের বলছি, আমরা অসাধারণ একটি দল ছিলাম। আর সে কারণেই আমরা এত কিছু অর্জন করতে পেরেছি।'

শেষ দিকে এসে মেসি নিজেই বুঝতে পারছিলেন, কথা থামানো তার জন্য কতটা কঠিন। মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটি, যিনি বছরের পর বছর চাপের মুহূর্তে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এবার নিজের আবেগের কাছেই যেন অসহায়। 'সত্যি বলতে, আমি আজ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি। আমি যেতে চাই না। আমি এই মাঠ ছাড়তে চাই না।'

তারপর কোনো বিশ্লেষণ নয়, কোনো বড় ঘোষণা নয়, শুধু নিজের মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে বলেন, 'আমি শুধু আপনাদের বলতে চাই, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। আপনাদের খুব মিস করব। আর ঈশ্বরের কাছে আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ যে আমি একজন আর্জেন্টাইন। আমি আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত। আর আপনাদের সবার সঙ্গে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরেছি, এ জন্যও আমি গর্বিত।'

'অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি।'