বিশ্বকাপের ৩৩ দিন বাকি

ব্রেমার পেনাল্টি আর ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার হৃদয়ভাঙা রাত

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

রোমের আকাশে সেদিন চাঁদ ছিল, কিন্তু আলো ছিল না। স্তাদিও অলিম্পিকোর বিশাল গ্যালারির নিচে রাতটা ধীরে ধীরে এমন এক বিষণ্ণতায় ডুবে যাচ্ছিল, যেন পৃথিবী আগে থেকেই জানত, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এক রাজা ভেঙে পড়বেন। সব ট্র্যাজেডির আগে যেমন বাতাস অকারণে ভারী হয়ে ওঠে, সেদিনও ঠিক তেমন ছিল। মাঠের ঘাসে ছড়িয়ে ছিল ক্লান্তির গন্ধ, মানুষের চিৎকারে মিশে ছিল আতঙ্ক, আর মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে থাকা দিয়েগো ম্যারাডোনাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন একা।

ভীষণ একা।

চার বছর আগে মেক্সিকোর সূর্যের নিচে যিনি ফুটবলকে নিজের আঙুলে নাচিয়েছিলেন, সেই মানুষটিকেই রোমে দেখে মনে হচ্ছিল আহত কোনো সম্রাট। জার্মান ডিফেন্ডারদের অবিরাম চাপ, লাথি, টান আর ধাক্কায় তাকে যেন ধীরে ধীরে মানুষের পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছিল। তার পা আর আগের মতো চলছিল না, শরীর ক্লান্ত, কিন্তু চোখে তখনও জ্বলছিল জেদের আগুন। কারণ ম্যারাডোনা জানতেন, কিংবদন্তিরা কখনও সম্পূর্ণভাবে হার মানে না। তারা ভাঙে, মচকায় না।

আর্জেন্টিনাও সেদিন ছিল ক্লান্ত এক সৈন্যদল। ১৯৮৬-এর ঝলমলে সৌন্দর্য নেই, নেই স্বাধীন ছন্দ। তারা খেলছিল দাঁতে দাঁত চেপে। যেন প্রত্যেকে নিজের বুক দিয়ে শেষ দেয়ালটা রক্ষা করতে চায়। কারণ ওপাশে ছিল পশ্চিম জার্মানির ঠান্ডা, নির্মম, যান্ত্রিক একটি দল, যারা অনুভূতির চেয়ে শৃঙ্খলাকে বেশি বিশ্বাস করে।

আর সময় যত গড়াচ্ছিল, তত মনে হচ্ছিল রাতটা হয়তো কোনোভাবে পার হয়ে যাবে। হয়তো অতিরিক্ত সময়। হয়তো টাইব্রেকার। হয়তো আবার কোনো অলৌকিকতা।

কারণ মাঠে ম্যারাডোনা থাকলে মানুষ শেষ বাঁশির আগ পর্যন্ত অলৌকিকতায় বিশ্বাস করতেই চায়।

তারপর এলো সেই বাঁশি।

৮৫ মিনিট।

রুডি ফোলার পড়ে গেলেন বক্সে।

রেফারি পেনাল্টি দিলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল কেউ যেন আর্জেন্টিনার বুকের ভেতর থেকে হঠাৎ সমস্ত বাতাস টেনে বের করে নিয়েছে। আকাশটা আরও নিচু হয়ে এল। ম্যারাডোনা দূর থেকে তাকিয়ে ছিলেন। তার চোখে এমন এক অবিশ্বাস ছিল, যা শব্দে ধরা যায় না। যেন তিনি ভাবছিলেন, এভাবেও কি শেষ হতে পারে?

আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে ধরল। প্রতিবাদ, চিৎকার, হাত নেড়ে এক মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু ইতিহাসের কিছু দরজা একবার খুলে গেলে আর বন্ধ হয় না।

পেনাল্টির জন্য বলটা রাখা হলো।

আর পুরো স্টেডিয়াম হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

সেই নীরবতা ছিল ভয়ংকর।

মনে হচ্ছিল রোম শহরের সমস্ত শব্দ কেউ কেড়ে নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ, অথচ কোনো আওয়াজ নেই। শুধু একজন মানুষ ধীরে ধীরে বলের দিকে এগিয়ে আসছেন।

আন্দ্রেয়াস ব্রেমা।

বাঁ-হাতি, বাঁ-পায়ের মানুষ। ডিফেন্ডার। পেনাল্টি স্পটে তার থাকার কথা নয়। কিন্তু তিনি হেঁটে আসছেন। শান্ত মুখে, মাথা সোজা, চোখ সামনে।

জার্মানির ডাগআউটে তখন ছোট্ট একটি নাটক হয়ে গিয়েছে। লোথার ম্যাথাউস, দলের অধিনায়ক, সেই মুহূর্তের সেরা ফুটবলার, নিয়মিত পেনাল্টি টেকার, বুট বদলে নতুন জুতো পরেছেন। ভেজা মাঠে পুরনো জুতো পিচ্ছিল লেগেছিল বলে। নতুন জুতোয় পেনাল্টি নিতে সাহস হলো না। তিনি মাথা নাড়লেন। না।

সাহসটা করেন তখন ওই ব্রেমা।

তিনি ছিলেন না আলোচিত কোনো ফুটবলার। না কোনো জাদুকর, না কোনো কবি। এমন একজন মানুষ, যাকে ইতিহাস সাধারণত এক পাশে রেখে দেয়। অথচ সেদিন ইতিহাস ঠিক করেছিল, তার সবচেয়ে নির্মম বাক্যটি এই মানুষটির পা থেকেই লেখা হবে।

ব্রেমা বলটা মাটিতে রাখলেন। তার মুখে কোনো আবেগ নেই। না উত্তেজনা, না ভয়। যেন তিনি বুঝতেই পারছেন না, এই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি দেশের হৃদয় ভেঙে যাবে।

অথচ কত অদ্ভুতভাবে বাঁ-পায়ের এই খেলোয়াড় মুহূর্তের সিদ্ধান্তে ঠিক করলেন ডান পায়ে শট নেবেন। বিশ্বকাপ ফাইনালের মৃত্যুসম চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের দুর্বল পায়ে শট নেওয়া, এটা যেন সাহস নয়, এটা প্রায় উন্মাদনা।

তবু সেই উন্মাদনায় ছিল এক অদ্ভুত যুক্তি।

আর্জেন্টিনার গোলকিপার সের্হিও গোয়কোচেয়া সেই টুর্নামেন্টে পেনাল্টির দেবতা হয়ে উঠেছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে, সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে, দুবার পেনাল্টি শুটআউটে দলকে বাঁচিয়েছেন। সেই গোলকিপার তখন রেখায় দাঁড়িয়ে, দুই হাত ছড়িয়ে, মানসিকভাবে ব্রেমাকে গ্রাস করতে প্রস্তুত। আর্জেন্টিনার শেষ আশ্রয়।

গোয়কোচেয়া জানতেন ব্রেমা বাঁ পায়ে শট নেবেন। ব্রেমাও জানতেন গোয়কোচেয়া সেটা জানেন। তাই সেই মুহূর্তে সবকিছু উল্টে দিলেন। নিজের স্বভাব, নিজের অভ্যাস, নিজের শরীরের সহজাত প্রবৃত্তি।

তারপর ব্রেমা দৌড়ালেন।

একটি ছোট রান-আপ।

একটি শট।

ডান পায়ের ঠান্ডা, নিখুঁত, নির্মম আঘাত।

বলটা জালের ভেতর ঢুকে পড়ল এমনভাবে, যেন সেটি কোনো গোল নয়, একটি হৃদয়ে ছুরি ঢুকে যাওয়ার শব্দ।

গোয়কোচেয়া ঝাঁপিয়েছিলেন ঠিক প্রান্তে, কিন্তু ইতিহাসের কাছে তার হাত পৌঁছায়নি।

আর ঠিক তখনই ম্যারাডোনার পৃথিবী ভেঙে পড়ল।

তিনি মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্থির হয়ে। চোখে ছিল শূন্যতা। এমন শূন্যতা, যা সাধারণ পরাজয়ের নয়। যেন কেউ তার কাছ থেকে শুধু বিশ্বকাপ নয়, তার আত্মার একটি অংশও কেড়ে নিয়েছে। তিনি জানতেন, আর ফেরার পথ নেই।

শেষ বাঁশি বাজার পর সেই কান্না দেখা গেল।

ফুটবলের সবচেয়ে গর্বিত মানুষগুলোর একজন কাঁদছেন। মাথা নামিয়ে। চোখ লুকিয়ে। একজন শিশুর মতো।

সেই কান্না শুধু তার একার ছিল না। সেই কান্নায় ছিল গোটা আর্জেন্টিনার বুকফাটা আর্তনাদ। বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় সেই রাতে মানুষ নিঃশব্দে বসে ছিল। কোনো চিৎকার নেই, কোনো ভাঙচুর নেই। শুধু এক গভীর, নিথর শোক। যে শোক কথা বলে না।

ম্যারাডোনা পরে বলেছিলেন, ওই রাতটি তার জীবনের সবচেয়ে ভারী রাত। কারণ তিনি শুধু হারেননি, তিনি লড়েছিলেন। পুরো টুর্নামেন্ট একটা ভাঙা শরীর আর ক্লান্ত পা নিয়ে, ইনজুরি লুকিয়ে, দলকে পিঠে বহন করে। তবু একজন মানুষ ডান পা তুলে তার সেই সব ত্যাগ মাটিতে মিশিয়ে দিলেন। এক ঝটকায়। বারো গজ দূর থেকে।

হ্যাঁ, ক্যামেরা তার দিকে স্থির হয়ে ছিল, আর কোটি কোটি মানুষ দেখছিল, দেবতারাও ভেঙে পড়ে।

আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মাটিতে বসে পড়েছিল। কেউ মাথা নিচু করে, কেউ শূন্য চোখে তাকিয়ে। তাদের শরীর থেকে যেন সমস্ত শক্তি বেরিয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল যুদ্ধশেষে পড়ে থাকা কোনো পরাজিত সেনাবাহিনী।

আর দূরে জার্মানরা উল্লাস করছিল।

ব্রেমা দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই উল্লাসের কেন্দ্রে। অথচ তিনি হয়তো নিজেও জানতেন না, তিনি শুধু একটি গোল করেননি। তিনি একটি স্বপ্ন হত্যা করেছেন।

ম্যারাডোনার শেষ বিশ্বকাপ ফাইনালের মহাকাব্যের শেষ লাইনটি লিখেছিলেন তিনি।

ডান পায়ের এক শটে।

এবং সেই শটের শব্দ আজও শোনা যায়, আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে নিঃশব্দ কান্নার ভেতর।