প্যারেন্টিং

শিশুর স্কুলের টিফিন কেমন হবে

লীনা ফেরদৌস
লীনা ফেরদৌস

সন্তানের টিফিন নিয়ে ভাবেন না—এমন অভিভাবক বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রতিদিন সকালেই একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে, ‘আজ কী দিলে শিশু আনন্দ করে খাবে?’

আবার কেবল পেট ভরলেই তো হবে না; খাবার হতে হবে পুষ্টিকর, নিরাপদ এবং শিশুর পছন্দেরও। তাই ছোট্ট একটি টিফিন বক্স কেবল খাবারের বক্স নয়, এতে থাকে একজন অভিভাবকের সচেতনতা, সৃজনশীলতা ও সন্তানের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার স্বপ্ন।

একসময় টিফিন মানেই ছিল রুটি-চিনি, ঘি মাখানো রোল, আলুভাজি দিয়ে পরোটা কিংবা কলা। তবে সময় বদলেছে। এখন শিশুদের দীর্ঘ সময় স্কুলে থাকতে হয়। পড়ালেখা, খেলাধুলা ও নানা ধরনের কার্যক্রম—সব মিলিয়ে তাদের শরীরের পাশাপাশি মস্তিষ্কও সারাক্ষণ কাজ করে।

How To Pack Bento for Kids: School Lunch Ideas
বর্তমানে রঙিন বেন্টো বক্সের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিদিনের সকাল, একই প্রশ্ন

ঢাকার উত্তরায় থাকেন তানজিনা হাসান। তার দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় টিফিন তৈরির মধ্য দিয়েই।
তানজিনা বলেন, আজকের ব্যস্ত জীবনে টিফিন তৈরি এক ধরনের ভারসাম্যের খেলা। একদিকে পুষ্টিবিদদের পরামর্শ, অন্যদিকে শিশুর রুচি। এখনকার শিশুরা টেলিভিশন, ইউটিউব কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই নতুন নতুন খাবার দেখে। তাই প্রতিদিন একই ধরনের টিফিন দিলে অনেক সময় তা না খেয়েই বাড়ি ফিরে আসে।

কী বলছেন পুষ্টিবিদ

উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ মোছা. মুসলিম আরা জেসমিন বলেন, প্রতিদিন প্রসেসড ফুড, প্যাকেটজাত নুডলস, বার্গার কিংবা চিপস দিয়ে টিফিন ভরা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়।

তিনি বলেন, ‘স্কুলের টিফিন শিশুর প্রতিদিনের পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এতে আমিষ, শস্য ও ফলমূলের সুষম সংমিশ্রণ থাকতে হবে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও ভাজাপোড়া যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।’

School Lunch Projects :: Photos, videos, logos, illustrations and branding
অনেক শিশু সকালে ঠিকমতো নাশতা করতে পারে না। তাই স্কুলের টিফিনই তাদের দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাবার। ছবি: সংগৃহীত

চেনা খাবার, নতুন উপস্থাপনা

চেনা খাবারকে একটু নতুনভাবে পরিবেশন করাই হতে পারে সবচেয়ে সহজ সমাধান। যে শিশু একেবারেই সবজি খেতে চায় না, তার জন্য গাজর, বিনস, ক্যাপসিকাম কুচি করে ডিম ও সামান্য চিজ দিয়ে বানানো ভেজি অমলেট রোল হতে পারে দারুণ একটি বিকল্প।

আবার ডিম, মুরগির মাংস, পনির কিংবা ডালের মতো প্রোটিনের সঙ্গে নানা রঙের সবজি যোগ করলে খাবার যেমন সুস্বাদু হয়, তেমনি বাড়ে পুষ্টিগুণও।

মুসলিম আরা জেসমিনের ভাষায়, ‘টিফিনে তাজা ফল ও সবজি রাখলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি দেওয়াও জরুরি। বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয়ভাবে খাবার পরিবেশন করলে শিশুরা আগ্রহ নিয়ে খায় এবং অপচয়ও কম হয়।’

পুষ্টির ভারসাম্য কেন জরুরি

পপুলার স্পেশালাইজড হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট ও ডায়েট কনসালট্যান্ট ফারিজা সুলতানা তুলি বলেন, শিশুর দিনের বড় একটি সময় কাটে স্কুলে। তাই টিফিনে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ভিটামিনের সঠিক ভারসাম্য থাকা জরুরি।

অনেক শিশু সকালে ঠিকমতো নাশতা করতে পারে না। তাই স্কুলের টিফিনই তাদের দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাবার। সঠিক পুষ্টি শিশুর শক্তি, মনোযোগ ও শেখার সক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।

Packed Lunch Vector Art, Icons, and Graphics for Free Download
প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা নিখুঁত বেন্টো বক্স তৈরি করা সব পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। ছবি: সংগৃহীত

রঙিন টিফিনে বাড়ে আগ্রহ

বর্তমানে রঙিন বেন্টো বক্সের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তবে বেন্টো বক্স না থাকলেও খাবার আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো যায়। কারণ শিশুরা প্রথমে চোখ দিয়েই খাবারকে বিচার করে।

বিটের রস মিশিয়ে লাল পরোটা, পালং শাক দিয়ে সবুজ রুটি, কুকি কাটার দিয়ে তৈরি তারা বা ফুল আকৃতির স্যান্ডউইচ—এ ধরনের ছোট ছোট পরিবর্তন শিশুর খাওয়ার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।

একটি আদর্শ টিফিনে কী থাকবে

পপুলার স্পেশালাইজড হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট অ্যান্ড ডায়েট কনসালট্যান্ট ফারিজা সুলতানা তুলির পরামর্শ অনুযায়ী, সুষম টিফিনে থাকতে পারে—একটি শস্যজাতীয় খাবার (রুটি, পরোটা, খিচুড়ি বা স্যান্ডউইচ), একটি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার (ডিম, মুরগি, পনির বা ডাল), মৌসুমি ফল, কিছু বাদাম (বয়স উপযোগী হলে), পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি, যেসব খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।

অনেক শিশুর টিফিনে এখনো নিয়মিত জায়গা করে নিচ্ছে প্যাকেটজাত চিপস, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত জুস কিংবা বিভিন্ন ধরনের প্রসেসড খাবার।

তার ভাষ্য, এসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, ট্রান্সফ্যাট ও কৃত্রিম রং থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

Tiffin Images – Browse 8,464 Stock Photos, Vectors, and Video | Adobe Stock
চেনা খাবারকে একটু নতুনভাবে পরিবেশন করাই হতে পারে সবচেয়ে সহজ সমাধান। ছবি: সংগৃহীত

ঘরেই তৈরি হোক স্বাস্থ্যকর টিফিন

পুষ্টিবিদ মোছা. মুসলিম আরা জেসমিন বলেন, ঘরেই খুব সহজে তৈরি করা যায় স্বাস্থ্যকর ও মজাদার টিফিন। যেমন—ডিম-সবজির স্যান্ডউইচ, চিকেন-সবজির বার্গার, ওটস ও কলার প্যানকেক, সবজি খিচুড়ি, পনির টোস্ট, সবজি পাকোড়া কিংবা গাজর-পেঁপের হালুয়া।

নিখুঁত টিফিন নয়, পুষ্টিই গুরুত্বপূর্ণ

প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা নিখুঁত বেন্টো বক্স তৈরি করা সব পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। কর্মজীবী বাবা-মা কিংবা ব্যস্ত সংসারে অনেক দিনই হয়তো তাড়াহুড়ো করে সাধারণ একটি টিফিনই গুছিয়ে দিতে হয়।

পপুলার স্পেশালাইজড হাসপাতালের ফারিজা সুলতানা তুলির মতে, এ নিয়ে অপরাধবোধের কোনো কারণ নেই। ভালো টিফিন মানেই দামি বা বাহারি টিফিন নয়; বরং ঘরে তৈরি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারই শিশুর জন্য সবচেয়ে মূল্যবান।

টিফিন শেখায় বন্ধুত্ব ও সামাজিকতা

টিফিন শুধু শরীরের পুষ্টিই নিশ্চিত করে না, গড়ে তোলে শিশুর সামাজিক ও মানসিক বিকাশও। বন্ধুদের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করা, নতুন স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া কিংবা একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস—এসব ছোট ছোট অভিজ্ঞতা শিশুর সামাজিক দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।

শেষ কথা টিফিনে বাহারি আয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ, পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার।