হরমুজে মার্কিন অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা ট্রাম্পের
হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলো সরিয়ে নেওয়ার মার্কিন সামরিক অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আল জাজিরার খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক ঘোষণায় ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের অনুরোধ এবং ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তির’ আলোচনায় ‘ব্যাপক অগ্রগতি’ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প তার পোস্টে লেখেন, আমরা উভয়পক্ষ একমত হয়েছি যে, অবরোধ আগের মতোই কার্যকর থাকবে, তবে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হবে।
চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন ও স্বাক্ষর করা যায় কি না, তা দেখার জন্যই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেই ট্রাম্পের এই ঘোষণাটি এলো। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বেশ কয়েকটি নৌকা, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ধ্বংস করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলা করেছে।
এরইমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজ একটি ‘অজ্ঞাত প্রক্ষেপকের’ আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) এই প্রণালির একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে ইরানের নিয়ন্ত্রিত এলাকা আরও বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার তারা জাহাজগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, নির্ধারিত পথ মেনে চলতে হবে, অন্যথায় ‘কঠোর জবাবের’ মুখে পড়তে হবে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপর আগে হামলা না করা পর্যন্ত আমরাও কোনো গুলি চালাব না।’ তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার জন্য ইরানকে অবশ্যই ‘মূল্য দিতে হবে’।
এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথটি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়ে থাকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান কার্যত এই পথটি বন্ধ করে রেখেছে।
এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতির পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান শান্তি আলোচনায় ওয়াশিংটনের শর্তগুলো মানতে তেহরানকে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নিজস্ব অবরোধ আরোপ করে।
এই শর্তগুলোর মধ্যে ছিল গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং সব ধরনের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করা। বর্তমানে এই প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে, যার ফলে তেল ও সারের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা ও খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের প্রকাশ্য অনমনীয় অবস্থান সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করছে।
ট্রাম্পের দাবি, ‘ইরান একটি চুক্তি করতে চায়। তবে তাদের একটা বিষয় আমার অপছন্দ—তারা আমার সঙ্গে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে কথা বলে, অথচ টেলিভিশনে গিয়ে বলে তারা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেনি। তারা আসলে চতুরতা করছে। তবে আমি আপনাদের বলছি, তারা চুক্তি করতে চায়। যখন সামরিক শক্তি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন চুক্তি ছাড়া উপায় থাকে না।’
আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজ দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকা ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইরানের সামরিক শক্তি এখন এতটাই কমে গেছে যে তারা কেবল পি-শুটার (খেলনা বন্দুকের মতো ছোট অস্ত্র) চালানোর ক্ষমতা রাখে।’
যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, ইরান ঠিক কী করলে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হবে, তিনি উত্তর দেন, ‘তারা ভালো করেই জানে, তাদের কী করা উচিত নয়।’
অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে শুরু হওয়া এই সহিংসতা চার সপ্তাহের পুরোনো যুদ্ধবিরতির কোনো লঙ্ঘন নয়।
পেন্টাগনে তিনি বলেন, ‘মার্কিন বাহিনীকে ইরানি জলসীমায় প্রবেশের প্রয়োজন হবে না। আমরা কোনো যুদ্ধ চাচ্ছি না। তবে ইরানকে আন্তর্জাতিক জলপথে নিরীহ দেশ ও তাদের পণ্য চলাচলে বাধা দিতে দেওয়া যাবে না।’
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমানে যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলেও তারা পরিস্থিতির ওপর অত্যন্ত কড়া নজর রাখছেন।