‘কোহিনূর’ তুমি কার?
আবারও আলোচনায় ‘কোহিনূর’। সেই মহামূল্যবান হীরকখণ্ড। এবার এ নিয়ে আলোচনার জন্ম হয়েছে এমন এক দেশে, যে দেশটির সঙ্গে ‘কোহিনূরের’ সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবুও ‘কোহিনূর’ বলে কথা।
গত ২৯ এপ্রিল আবারও সেই ঐতিহাসিক কোহিনূর দ্যুতি ছড়ালো সারা দুনিয়ায়।
ফারসি শব্দ কোহ (পাহাড়) ও আরবি শব্দ নূর (আলো) মিলে ‘কোহ-ই-নূর’ বা ‘কোহিনূর’ শব্দটি তৈরি হয়েছে। এর অর্থ ‘আলোর পাহাড়’। অর্থাৎ, এই শব্দটির মাধ্যমে এই হীরার উজ্জ্বলতা ও মাহাত্ম্য তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনে যোগ দিতে গত ২৭ এপ্রিল ওয়াশিংটন ডিসিতে সস্ত্রীক গিয়েছিলেন ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস।
দেশটিতে ৪ দিনের রাজকীয় সফরের অংশ হিসেবে গত ২৯ এপ্রিল নিউইয়র্ক শহরে গিয়েছিলেন রাজা-রানি।
সেদিন সেই মহানগরীর বিধ্বস্ত বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র তথা বিশ্বখ্যাত টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণ করেন ব্রিটিশরাজ। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সেই হামলায় ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।
সেই স্মরণ-অনুষ্ঠানের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র জোহরান মামদানি জন্ম দেন ‘কোহিনূর’ আলোচনার। এরপর আলোর গতিতেই কোহিনূরের কিরণ ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক ভিডিও থেকে জানা যায়, এক প্রশ্নের জবাবে নিউইয়র্কের মেয়র বলেন, রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে দেখা-পরিচয়ের পর তিনি তাকে কোহিনূর ‘ফিরিয়ে দেওয়ার’ পরামর্শ দিতে চান।
হীরকখণ্ড কোহিনূরকে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ও মূল্যবান রত্ন হিসেবে গণ্য করা হয়।
ইতিহাস বলছে—১৮৪৯ সালে উপনিবেশিক ব্রিটিশ বাহিনী ভারতে শিখ সেনাদের পরাজিত করে তৎকালীন পাঞ্জাব রাজ্য দখল করে। সেই সময় থেকে ব্রিটিশ রাজমুকুটের অংশ হয়ে যায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হীরকখণ্ড কোহিনূর।
১৯৪৭ সালে ভারতে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর এই মহামূল্যবান কোহিনূরকে চুরি করা রত্ন আখ্যা দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে আরও জানা যায়—ভারতের অভিযোগ, চুরি করা হয়েছে ‘কোহিনূর’। দেশটি বারংবার তা ফেরতের দাবি জানিয়ে আসছে। আর ব্রিটেনের পক্ষ থেকে তা বারবার প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।
জোহরান মামদানি সেই পুরোনো বিতর্ক যেন বিশ্বমঞ্চে নতুন করে উসকে দিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে নিউইয়র্কের মেয়র বললেন, ‘ব্রিটিশ রাজার সঙ্গে যদি একান্তভাবে কথা হয়, তাহলে হয়ত তাকে কোহিনূর হীরা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে উৎসাহ জোগাবো।’
বর্তমানে কোহিনূর ব্রিটিশ রাজমুকুটের অংশ এবং টাওয়ার অব লন্ডনে প্রদর্শন করা হচ্ছে।
কোহিনূরের ‘বিতর্কিত’ ইতিহাস
বিশ্বখ্যাত কোহিনূর সম্পর্কে বিশ্বকোষ ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে—১০৫ দশমিক ৬ ক্যারাটের এই ‘কোহিনূর’ বিশ্বের অন্যতম সেরা হীরা। এর মালিকানা নিয়ে বিতর্ক আছে।
প্রথমদিকে, এই হীরার ওজন ছিল ১৯১ ক্যারেট। ১৮৫২ সালে কোহিনূরের উজ্জ্বলতা বাড়াতে রাজকীয় জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান গ্যারার্ড অব লন্ডন এই হীরাটি কেটেছিল।
১৮৪৯ সাল থেকে এই রত্ন ব্রিটিশ রাজমুকুটের অংশ হয়ে আছে বলেও ব্রিটানিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতসহ কয়েকটি দেশ কোহিনূরের মালিকানা দাবি করে আসছে। শুধু তাই নয়, দেশগুলো এই রত্ন ফেরত পাওয়ার দাবিও জানিয়ে আসছে।
ব্রিটানিকা আরও জানায়—পরবর্তীতে ‘কোহিনূর’ নাম পাওয়া এই হীরার কথা প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে উল্লেখ করা আছে। এমনকি, খ্রিষ্টপূর্ব ৩২০০ বছর আগে বর্তমানের ইরাক বা তৎকালীন মেসোপটেমিয়ার লেখাগুলোয় এই হীরার কথা বলা হয়েছে। তবে এসব মত বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।
অনেক বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন যে, ১৩০৪ সালে দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি মধ্য ভারতের মালওয়া রাজ্যের রাজার কাছ থেকে এই মহারত্নটি নিয়েছিলেন। রাজ পরিবারটি বহু প্রজন্ম ধরে সেই রত্নের মালিক ছিল।
কোনো কোনো লেখক দাবি করেন যে, ১৫২৬ সালে পানিপথ যুদ্ধের পর গোয়ালিরের রাজা এই হীরা মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের ছেলেকে দিয়েছিলেন।
কেউ বলছেন, ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম কৃষ্ণ নদীর তীরে কল্লুর খনি থেকে পাওয়া এই হীরা ১৬৫৬ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহানকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।
১৬৬৫ সালে ফরাসি অলংকার ব্যবসায়ী জাঁ-বাতিস্ত তাভেরনিয়ার এক লেখায় এই ‘মুঘল হীরা’ কাটার কথা বলেছেন বলেও দাবি অনেক গবেষকের।
ঘটনার শেষ নেই!
ব্রিটানিকার তথ্য অনুসারে—অন্যান্য বর্ণনায় বলা হয়েছে যে ১৭৩৯ সালে ইরানের সম্রাট নাদির শাহ দিল্লি লুটের সময় কোহিনূরও সঙ্গে নিয়ে যান। তার মৃত্যুর পর সেই রত্ন পড়ে সেনাধ্যক্ষ আহমাদ শাহের হাতে। পরবর্তীতে এই সেনাধ্যক্ষ আফগানিস্তানে দুরানি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আহমাদ শাহের উত্তরসূরি শাহ সুজা এই মহারত্ন নিয়ে ভারতে পালিয়ে আসার পর পাঞ্জাবের শাসক রণজিৎ সিং তার হাত থেকে কোহিনূর কেড়ে নেন।
১৮৪৯ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক সেনারা পাঞ্জাব দখল করলে তাদের হাতে পড়ে কোহিনূর। তারপর তা রানি ভিক্টোরিয়ার মুকুটে যুক্ত হয়।
ইতিহাস আরও বলছে—১৮৫১ সালে লন্ডনে কোহিনূর প্রদর্শন করা হলে দর্শনার্থীরা এর উজ্জ্বলতা নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন। তখন এই হীরাকে আবার কাটা হয়। ফলে এই আকার অনেক ছোট হয়ে যায়।
ব্রিটানিকার ভাষ্য: কোহিনূর দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। ভারত এই রত্নটি চুরির অভিযোগ এনে তা ফেরতের দাবি জানাচ্ছে। কারও দৃষ্টিতে এটি উপনিবেশিক শক্তির বিজয়ের প্রতীক।
ব্রিটিশ রাজ এমন অপবাদ থেকে দূরে থাকতে কোহিনূরের রাজকীয় ব্যবহার কমিয়ে দেয়।
২০২৩ সালে রাজা তৃতীয় চার্লসের সিংহাসনে বসার সময় অনেক জল্পনার জন্ম হয়েছিল এই কোহিনূরকে ঘিরে।
তবে বাকিংহাম প্রাসাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, রাজকীয় অনুষ্ঠানে কোহিনূর প্রদর্শন করা হবে না।
কোহিনূরের প্রকৃত মালিক কে?
গত ২৯ এপ্রিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই রত্ন ব্রিটেন ও ভারতের মধ্যে বিবাদের ‘কাঁটা’ হয়ে আছে। ভারত ছাড়াও ইরান ও পাকিস্তান এই রত্ন ফেরতের দাবি জানিয়ে আসছে।
এতে বলা হয়—আফ্রিকায় ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের পরিণতি সম্পর্কে জোহরান মামদানি তার শিক্ষাবিদ-গবেষক বাবা মাহমুদ মামদানির কাছ থেকে অনেককিছু জেনেছেন। বাবার চিন্তাভাবনায় প্রভাবিত হয়েই জোহরান হয়ত ব্রিটিশরাজের প্রতি শীতল ভাব দেখাচ্ছেন।
জোহরান মামদানির এমন মন্তব্য নিয়ে ব্রিটিশ রাজকীয় পরিবারের এক মুখপাত্রের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমটির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
২০০০ সালের ৫ নভেম্বর দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়েছিল—তালেবান সরকার ব্রিটিশ রানিকে কোহিনূর রত্ন ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করছে।
সেই হিসাবে কোহিনূরের দাবিদার দক্ষিণ এশিয়ার ৪ দেশ—ভারত, পাকিস্তান, ইরান ও আফগানিস্তান।
গত ৩০ এপ্রিল ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়—১৮৪৯ সালে উপনিবেশিক শাসক ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক ভারতীয় রাজ পরিবারের ১০ বছরের বালককে কোহিনূরের মালিকানা ছেড়ে দিতে চাপ দেয়। সর্বশেষ, ২০১৬ সালে ভারত কোহিনূর ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিল।
২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘কোহিনূর চুরি করা হয়নি।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত সরকার বলছে যে কোহিনূর চুরি করা হয়নি। বরং এক ভারতীয় রাজা ব্রিটেনকে সেই হীরা উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। এমন বার্তা অনেক ভারতীয়কে ক্ষুব্ধ করেছিল বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়। তাদের বিবেচনায় সেই হীরা উপনিবেশিক শক্তি চুরি করেছিল।
সেদিন এক টুইটে দ্য কারাভান সাময়িকীর রাজনীতি বিভাগের সম্পাদক হরতোশ সিং বল লিখেছিলেন, ‘ভাঁড়েরা চালায় মোদি সরকার: রণজিৎ সিং কোহিনূর ব্রিটিশদের দিয়েছিলেন? তিনি তো মারা যান ১৮৩৯ সালে। ব্রিটিশরা সেই হীরা ছিনিয়ে নেয় ১৮৪৯ সালে!’
তাই ইতিহাসের গহ্বরে আজও কী প্রশ্ন উঠে—‘কোহিনূর’ তুমি কার?
সেই প্রশ্নের কি প্রতিধ্বনি হয় বর্তমানের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে?—এমন পাল্টা প্রশ্নও কি জাগে কারো কারো মনে?







