মির্জাপুর গণহত্যা: দানবীর রণদা প্রসাদ সাহাকে যেভাবে হারিয়েছিল দেশ

আহমাদ ইশতিয়াক
আহমাদ ইশতিয়াক

১৯৭১ সালের ৭ মে, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর বাজারের হাটবার। সকাল থেকে ক্রেতা-বিক্রেতার আগমনে জমে উঠেছিল লৌহজং নদী তীরবর্তী হাট প্রাঙ্গণ।

এদিন আনুমানিক দুপুর দুইটার দিকে মির্জাপুর থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াদুদ ওরফে ওয়াদুদ মৌলানার নেতৃত্বে তার ছেলে মাহবুবুর রহমান ও আবদুল মান্নানের সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল মির্জাপুর বাজারের পাশে কুমুদিনী কমপ্লেক্সে অভিযান চালায়।

এসময় তারা দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ও তার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহার খোঁজ করে।

ছবি
কুমুদিনী হাসপাতালে এক দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করছেন রণদা প্রসাদ সাহা। ছবি: সংগৃহীত।

উপস্থিত চিকিৎসক ও নার্সরা জানান, তারা দুজন এই মুহূর্তে মির্জাপুরে নেই। খোঁজ করতে আসা রাজাকারেরা এসময়ে পুরো হাসপাতাল প্রাঙ্গণ, ভারতেশ্বরী হোমসসহ আরপি সাহার বাড়ি তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালিয়েও তাদের খুঁজে পায়নি। একপর্যায়ে তারা চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের চরম অপমান করে হত্যার হুমকি দেয়। 

এর আগে ওইদিন দুপুরে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা লৌহজং নদীর তীরে হিন্দু অধ্যুষিত বাইমহাটি, সরিষাদাইড় ও আন্ধারা গ্রাম ঘিরে ফেলে গণহত্যা শুরু করে। ঘাতকেরা যাকে যে অবস্থায় পেয়েছে, তাকেই ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেছে। গণহত্যায় এদিন শিশু-নারী-বৃদ্ধসহ অন্তত ৩৩ জন নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হন।

গণহত্যা চলাকালে হানাদারেরা পাশের পুষ্টকামুরী গ্রামের জয়নাল সরকারকে তার ঘরে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করে। গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দেওয়ার অভিযোগে তারা একই গ্রামের মাজম আলীকে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করে। গণহত্যা শেষে তারা বাইমহাটি ও সরিষাদাইড় গ্রামের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। 

এরপর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াদুদ গোপন সূত্রে জানতে পারেন, রণদা প্রসাদ সাহা ও তার ছেলে নারায়ণগঞ্জে আছেন। খবর শোনামাত্র তখনই ছেলে মাহবুবুর রহমান ও আবদুল মান্নানকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের পথে রওয়ানা হন।

ছবি
রণদা প্রসাদ সাহার হত্যায় অভিযুক্ত মাহাবুবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত।

এদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জের খানপুরে রণদা প্রসাদ সাহার বাড়িতে হামলা চালায় তারা। এসময় তারা রণদা প্রসাদ সাহা, ভবানী প্রসাদ সাহা, কর্মচারী রাখাল মতলব, গৌর গোপাল সাহাসহ সাতজনকে বাড়ি থেকে তুলে আদমজী বার্মা ইস্টার্ন অয়েল ডিপোতে নিয়ে যায়। পরে সেখানে তাদের হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ ফেলে দেয়। 

নিভে যায় রণদা প্রসাদ সাহার জীবনপ্রদীপ, সারাজীবন মানবতার প্রশ্নে যিনি ছিলেন অবিস্মরণীয় এক ব্যক্তিত্ব। জনকল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, নারীশিক্ষার প্রসার, দানশীলতাসহ সমস্ত মানবহিতৈষী কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন সুনিবেদিত, সুপরিচিত এক মহাত্মা। 

ছবি
পঞ্চাশের দশকের তোলা ছবিতে রণদা প্রসাদ সাহা প্রতিষ্ঠিত ভারতেশ্বরী হোমস। ছবি: সংগৃহীত

রণদা প্রসাদ সাহা অতিদরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন। তার পরিবারে একবেলা খাবার জুটলে পরের দুবেলা তাদের উপোস থাকতে হতো। সন্তান প্রসবের সময় ধনুষ্টংকারে ভুগে বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিলেন তার মা।

মায়ের মৃত্যুশয্যায় বসে রণদা প্রসাদ সাহা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—জীবনে যদি কখনো সুযোগ হয়, তাহলে দরিদ্র মা ও অসহায় নারীদের চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। 

মায়ের মৃত্যুর পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে সে সংসারে আরপি সাহার ওপর নেমে আসে সৎ মায়ের অত্যাচার। একপর্যায়ে অভাবের তাড়নায় চৌদ্দ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতায় চলে যান তিনি।

দিনে হাওড়া রেলস্টেশনে পত্রিকা বিক্রি করতেন আর রাতের বেলায় চলতো কুলির কাজ। এমন সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে যোগ দিয়ে ইরাকে চলে যান তিনি। 

সেখানে এক হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রোগীদের জীবন বাঁচালে তাকে নতুন প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল রেজিমেন্টে কমিশন দেওয়া হয়। যুদ্ধ শেষে পেয়েছিলেন পঞ্চম জর্জের সাথে সাক্ষাতের সুযোগও। দেশে ফিরে এসে রেলওয়ের টিকিট কালেক্টরে চাকরিতে ঢোকেন আরপি সাহা। 

স্বল্প বেতনে সংসার চললেও মানবসেবা সম্ভব ছিল না রণদার পক্ষে। এক দশকের চাকরি জীবনে তারপরও কিছু অর্থ জমিয়েছিলেন তিনি। জমানো সেই অর্থ ও বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ধারদেনা করে লবণ ব্যবসা শুরু করেন। ওইসময় লবণের সংকট থাকায় এ ব্যবসায় বিপুল লাভ করেন রণদা। একপর্যায়ে কয়লার ব্যবসাও শুরু করেন তিনি। একে একে তার ব্যবসায়ের পরিধি বাড়তে থাকে।

১৯৩৩ সালে দ্য বেঙ্গল রিভার সার্ভিস কোম্পানি নামে নৌ পরিবহনের ব্যবসা ও বীমা কোম্পানি খোলেন আরপি সাহা। ১০ বছরের মাথায় অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক সরকারের খাদ্য-শস্য কেনার প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। 

এক বছরের ব্যবধানেই তিনি এক ইংরেজ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নারায়ণগঞ্জের একটি বড় পাটকল ও পাট সংরক্ষণের জন্য বেশ কয়েকটি গুদাম  কিনে নেন। শুরু করেন চামড়ার ব্যবসাও। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও কুমিল্লায় ইংরেজদের থেকে কিনে নেন তিনটি পাওয়ার হাউস। ধীরে ধীরে রণদা প্রসাদ সাহা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনকুবের ও সম্পদশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন। 

নিজে সম্পদশালী হলেও মাতৃভূমি ও দেশের দরিদ্র মানুষের কথা ভুলে যাননি আরপি সাহা। ব্যবসা সম্প্রসারণের মধ্যেই চলছিল তার মানবসেবা। 

ছবি
পঞ্চাশের দশকের তোলা ছবিতে লৌহজং নদী তীরবর্তী কুমুদিনী হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

১৯৩৮ সালে মা কুমুদিনী দেবীর নামে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী ডিস্পেনসারি নামে ২০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল। বর্তমানে যা এক হাজারেরও বেশি শয্যা বিশিষ্ট কুমুদিনী হাসপাতাল।

নারী শিক্ষার প্রসারে ১৯৪৫ সালে গড়ে তোলেন বিখ্যাত ভারতেশ্বরী হোমস। এটি আজো দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবাসিক বিদ্যালয়ের মধ্যে একটি। 

পাশাপাশি দক্ষ সেবিকা গড়ে তোলার জন্য মির্জাপুরে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী নার্সিং মহিলা স্কুল ও কলেজ। প্রতিষ্ঠা করেন মির্জাপুর কলেজ, মির্জাপুর এস কে পাইলট বালক ও বালিকা বিদ্যালয়সহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

১৯৪২ সালে তেরশ্রীর জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায়ের উদ্যোগে মানিকগঞ্জের তেরশ্রীতে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এক বছর পরেই রণদা প্রসাদ সাহার আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি মানিকগঞ্জে স্থানান্তরিত হয়। সেসময় কলেজটিতে ৬০ হাজার টাকা দান করেছিলেন আরপি সাহা। এসময় তার বাবার নামে দেবেন্দ্র কলেজের নামকরণ করা হয়। 

কেবল শিক্ষা বা চিকিৎসাই নয়, ১৯৪৭ সালে নিজের সব ব্যবসা, কলকারখানা, সম্পত্তি ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার জন্য ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল’ গঠন করেন রণদা প্রসাদ সাহা। ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাকালেই রণদা বলেছিলেন, তার সমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত আয়ের অর্ধেক অংশ অনাথ ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। 

তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে থাকার জন্য রণদা প্রসাদ সাহা রেডক্রস সোসাইটিতে এককালীন তিন লক্ষ টাকা দান করেছিলেন। এছাড়া তার উদ্যোগে কেবল পূর্ববঙ্গেই আড়াইশরও বেশি লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল।

সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় এদেশের প্রায় সব হিন্দু ধর্মাবলম্বী জমিদার ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ভারতে পাড়ি জমালেও মাতৃভূমি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার চিন্তা করেননি রণদা প্রসাদ সাহা। বরং জাতি বর্ণ, ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে অসহায় মানুষের সেবায় আমৃত্যু নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছিলেন তিনি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন রণদা প্রসাদ সাহা। নিজের সমস্ত ধনভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায়। 

এসব পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসরদের চোখ এড়ায়নি। মহীরুহতুল্য এই মানুষটিকে হত্যা করতে আসে ঘাতকরা। উদ্দেশ্য ছিল রণদা প্রসাদ সাহার সমস্ত জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা দখলের পাশাপাশি তার সমস্ত গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাবকে সমূলে ধ্বংস করা। 

কিন্তু ঘাতকেরা জানে না বাংলার মাটিতে রণদা প্রসাদ সাহার মতো মহাত্মার অস্তিত্ব কখনোই বিলীন হওয়ার নয়। তাইতো আজো তার গড়া প্রতিষ্ঠানগুলো পথিকৃৎ হয়ে মানবসেবায় ভূমিকা রেখে চলছে।

ছবি
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে রণদা প্রসাদ সাহার স্মৃতিস্মারক।

 

একাত্তরের ৭ মে রণদা প্রসাদ সাহা, ভবানী প্রসাদ সাহাকে অপহরণের পর হত্যা ও মির্জাপুরে সংঘটিত গণহত্যার অপরাধের দায়ে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে ২০১৯ সালের ২৭ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রাজাকার মাহবুবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করে। 

তবে ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে মাহবুবুর রহমান মারা যাওয়ায় সেই রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর আগেই মারা যান মির্জাপুর থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াদুদ ওরফে ওয়াদুদ মৌলানা ও তার ছেলে আবদুল মান্নান।

সহায়ক সূত্র:  রণদা প্রসাদ সাহা স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনা- আনিসুজ্জামান

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রণদা প্রসাদ সাহা হত্যার বিচারিক কার্যক্রম