৬৫ দিন বাকি

বিশ্বকাপ অভিষেকের গৌরবগাথা: যখন নবাগতরাই কাঁপিয়ে দিয়েছিল বিশ্বকে

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে পা রাখাই যেখানে আজন্ম লালিত স্বপ্ন, সেখানে প্রথমবার এসেই বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়াটা বীরত্বগাথার চেয়ে কম কিছু নয়। বিশ্বকাপের যাত্রা শুরুর দিনগুলোতে নিজেদের অভিষেক আসরে শিরোপা জিতে উরুগুয়ে (১৯৩০) ও ইতালি (১৯৩৪) এক অজেয় মানদণ্ড স্থাপন করেছে। তবে ফুটবলের আধুনিক যুগে বিশ্বকাপের লড়াই ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠেছে, ফেভারিটদের ভীড়ে নবাগতদের জন্য পথ চলা যেন অগ্নিপরীক্ষার অপর নাম। তবুও কিছু দল নিজেদের প্রথম আবির্ভাবেই ঝাণ্ডা উড়িয়েছে ফুটবলের সর্বোচ্চ আয়োজনে।

সেসব গল্প কেবল হার-জিতের নয়, বরং ফুটবল মানচিত্রকে ওলটপালট করে দেওয়ার। পর্তুগালের 'ইউসেবিও ম্যাজিক' থেকে শুরু করে ক্রোয়েশিয়ার বিস্ময়কর উত্থান— প্রতিটি পদচিহ্নই ছিল অনুপ্রেরণার। সেনেগাল, কোস্টারিকা, আলজেরিয়া, সৌদি আরব, ওয়েলস, ঘানা, উত্তর কোরিয়া বা নাইজেরিয়ার মতো দলগুলো যখন প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিল, তখন ফেভারিটদের দর্প চূর্ণ হতে সময় লাগেনি।

এবারের আয়োজন বিশ্বকাপের সেই অকুতোভয় নবাগতদের নিয়ে, যারা চমক জাগানো নৈপুণ্যে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ফুটবল বিশ্বকে।

১৯৬৬: পর্তুগাল

বিশ্বকাপের অভিষেকে পর্তুগালের ১৯৬৬ সালের পারফরম্যান্স ইতিহাসের অন্যতম সেরা মানদণ্ড হয়ে আছে। 'ব্ল্যাক প্যান্থার' খ্যাত কিংবদন্তি ইউসেবিওর নেতৃত্বে পর্তুগিজরা পুরো টুর্নামেন্টে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। গ্রুপ পর্বে তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ৩-১ গোলে হারিয়ে পেলেকে বিদায় করে দেওয়াটা ছিল এক বিশাল চমক। আর উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে তাদের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি তো এখন লোকগাথায় পরিণত হয়েছে! ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ইউসেবিও একাই চারবার জাল কাঁপালে পর্তুগাল ৫-৩ ব্যবধানে এক মহাকাব্যিক জয় পায়। এরপর সেমিফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের কাছে সামান্য ব্যবধানে হারলেও সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারিয়ে তারা তৃতীয় স্থান অর্জন করে। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পথে ৯ গোল করেছিলেন ইউসেবিও।

১৯৯৮: ক্রোয়েশিয়া

যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৯৮ সালে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে ক্রোয়েশিয়ার অভিষেক হয়েছিল বিশ্বকাপে। মিরোস্লাভ ব্লাজেভিচের অধীনে তাদের সেই 'সোনালী প্রজন্ম' টেকনিক্যাল দক্ষতা ও তীব্র দেশপ্রেমের এক অসাধারণ মিশেল তৈরি করেছিল। গ্রুপ পর্ব সফলভাবে পার করার পর কোয়ার্টার ফাইনালে পরাশক্তি জার্মানিকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দেয় তারা। সেমিফাইনালে এগিয়ে গেলেও স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে শেষমেশ পরাস্ত হতে হয় ক্রোয়াটদের। তারপর নেদারল্যান্ডসকে ২-১ গোলে হারিয়ে তারা ঐতিহাসিক তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে। ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতে নেন দাভর সুকার। সব মিলিয়ে ফুটবলের অভিজাত মহলে নতুন একটি দেশের দাপুটে আগমন ঘটেছিল।

১৯৬৬: উত্তর কোরিয়া

১৯৬৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। 'সম্পূর্ণ রহস্যময়' এক দল হিসেবে আসরে এসে প্রথম ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে তারা একরকম বাতিলের খাতায় চলে গিয়েছিল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে শক্তিশালী ইতালিকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় দলটি। পাক দু-ইকের সেই বিখ্যাত গোলটি অমর হয়ে আছে ফুটবল ইতিহাসে। এই ফলাফলে ইতালি বিব্রতকরভাবে বিদায় নেয় এবং উত্তর কোরিয়া প্রথম এশিয়ান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পৌঁছায়। এমনকি কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের বিপক্ষে মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যে তারা ৩-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে এক অভাবনীয় অলৌকিক ঘটনার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ইউসেবিওর জাদুতে সেই রূপকথার অবসান ঘটে।

২০০২: সেনেগাল

২০০২ বিশ্বকাপে সেনেগালের যাত্রা শুরু হয়েছিল এক বিশাল ধামাকা দিয়ে। উদ্বোধনী ম্যাচেই তারা তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয়। কোচ ব্রুনো মেৎসুর অধীনে 'তেরাঙ্গার সিংহরা' এমন এক নির্ভীক ও আনন্দময় ফুটবল খেলেছিল, যা বিশ্বজুড়ে ভক্তদের মন জয় করে নেয়। কঠিন গ্রুপ পার করে শেষ ষোলোতে হেনরি কামারার গোল্ডেন গোলে তারা সুইডেনকে পরাজিত করে। কোয়ার্টার ফাইনালে তুরস্কের কাছে হেরে সেনেগালের দৌড় থামলেও ১৯৯০ সালের ক্যামেরুনের পর দ্বিতীয় আফ্রিকান দল হিসেবে তারা শেষ আটে ওঠার কীর্তি স্পর্শ করে।

১৯৯০: কোস্টারিকা

১৯৯০ বিশ্বকাপে কোস্টারিকা যখন খেলতে আসে, তখন তারা ছিল চরম আন্ডারডগ। কিন্তু অদ্ভুতুড়ে বোরো মিলুতিনোভিচের অধীনে তারা সব হিসাবনিকাশ পাল্টে দেয়। ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড ও সুইডেনের মতো শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে একই গ্রুপে থাকায় ভাবা হয়েছিল, তারা দ্রুতই বিদায় নেবে। কিন্তু তারা স্কটল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় এবং সুইডেনের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ গোলে জিতে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়। তাদের গোলরক্ষক লুইস গ্যাবেলো কোনেহো তার অ্যাক্রোবেটিক সেভ দিয়ে জাতীয় বীরে পরিণত হন। দ্বিতীয় রাউন্ডে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে হার সত্ত্বেও কোস্টারিকার কৌশলগত শৃঙ্খলা ও সাফল্য মধ্য আমেরিকান ফুটবলকে বিশ্বের মানচিত্রে শক্ত জায়গা করে দেয়।

১৯৯৪: নাইজেরিয়া

ফিনিদি জর্জ, রাশিদি ইয়েকিনি ও ড্যানিয়েল আমোকাচির মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড় নিয়ে গঠিত নাইজেরিয়া দল ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ঝড় তোলে। বুলগেরিয়াকে ৩-০ গোলে চূর্ণ করে তারা নিজেদের শক্তিমত্তা জানান দেয়। গোলের পর ইয়েকিনির জালের ভেতর বুনো উল্লাস বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক ছবি হয়ে আছে। আর্জেন্টিনা ও বুলগেরিয়ার মতো দল থাকা সত্ত্বেও 'সুপার ঈগলরা' গ্রুপ সেরা হয়। তাদের দ্রুতগতিসম্পন্ন ও আক্রমণাত্মক ফুটবল দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। কোয়ার্টার ফাইনালেরও খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল তারা, দ্বিতীয় রাউন্ডে ৮৮তম মিনিট পর্যন্ত ইতালির বিপক্ষে এগিয়ে ছিল। কিন্তু রবার্তো ব্যাজ্জিওর জাদুতে ম্যাচটি হাতছাড়া হয় তাদের।

১৯৯৪: সৌদি আরব

১৯৯৪ সালে সৌদি আরবের অভিষেক আসরটি ইতিহাসের অন্যতম সেরা একক নৈপুণ্যের গোলের জন্য অমর হয়ে আছে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে সাঈদ আল-ওয়াইরানের সেই 'ম্যারাডোনা-সদৃশ' ছুটতে থাকা! নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে গিয়ে তার গোলে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছিল সৌদি। তারা মরক্কোকেও হারিয়েছিল এবং বেলজিয়ামের উপরে থেকে গ্রুপ পর্ব শেষ করেছিল। এরপর নকআউটে শক্তিশালী সুইডেনের কাছে ৩-১ গোলে হেরে থামে তাদের যাত্রা। ১৯৮৬ সালের মরক্কোর পর দ্বিতীয় আরব দেশ হিসেবে তারা গ্রুপ পর্ব পার করেছিল।

২০০৬: ঘানা

২০০৬ বিশ্বকাপে ঘানা ছিল একমাত্র আফ্রিকান দল, যারা গ্রুপ পর্ব পার হতে পেরেছিল। প্রথম ম্যাচে ওই আসরের চ্যাম্পিয়ন ইতালির কাছে হারলেও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। তারা তৎকালীন ফিফা র‍্যাঙ্কিং অনুসারে দুই নম্বর দল চেক প্রজাতন্ত্রকে ২-০ গোলে ও যুক্তরাষ্ট্রকে ২-১ গোলে পরাজিত করে। মাইকেল এসিয়েন ও স্টিফেন আপিয়ার মতো মিডফিল্ডার ছিলেন ঘানার লড়াকু ফুটবলের কারিগর। শেষ ষোলোতে ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায় নিলেও এই পারফরম্যান্সই চার বছর পর তাদের সেই স্মরণীয় কোয়ার্টার ফাইনাল যাত্রার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

১৯৮২: আলজেরিয়া

১৯৮২ সালে আলজেরিয়ার অভিষেক একদিকে যেমন নৈপুণ্যের জন্য, অন্যদিকে তেমনি অন্যায়ের শিকার হওয়ার জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। তারা তৎকালীন ইউরো চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তাদের হয়ে গোল করেছিলেন রাবাহ মাজদার ও লাখদার বেলৌমি। এরপর অস্ট্রিয়ার কাছে হারলেও চিলির বিপক্ষে ৩-২ গোলে জিতে তারা যখন দ্বিতীয় রাউন্ডের দোরগোড়ায়, তখনই ঘটে এক লজ্জাজনক ঘটনা। পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া মিলে এমন এক ফলাফল তৈরি করে, যাতে আলজেরিয়াকে বাদ দিয়ে উভয় দলই পরের রাউন্ডে যেতে পারে! অস্ট্রিয়ানদের ১-০ গোলে হারিয়েছিল জার্মানরা, যা 'ডিসগ্রেস অফ গিখন' নামে কুখ্যাত। এই কেলেঙ্কারির পর ফিফা নিয়ম পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় এবং পরের আসর থেকে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।