হামজা-শমিতদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হবেন কে?

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

সবুজ গালিচায় নতুন রূপকথার অপেক্ষায় বাংলাদেশ ফুটবল। শেষ হতে যাচ্ছে হাভিয়ের কাবরেরার অধ্যায়। তার ডাগআউটের ক্যানভাসটা এখন প্রায় শূন্য, তবে এরমধ্যেই সেখানে নতুন রং তুলির আঁচড় কাটতে উন্মুখ হয়ে আছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের রথী-মহারথীরা। বাফুফের দপ্তরে এখন যেন প্রত্যাশার হিমালয়; কেবল জাতীয় দলের প্রধান কোচ হওয়ার বাসনায় জমা পড়েছে তিন শতাধিক আবেদনপত্র। এর সঙ্গে বয়সভিত্তিক দলের জন্য প্রায় একশো এবং গোলকিপিং কোচের জন্য আরও ৪০টি জীবনবৃত্তান্ত।

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের তলানিতে থাকা একটি দেশের জন্য বিশ্বমানের কোচদের এমন অভাবনীয় আগ্রহ আক্ষরিক অর্থেই বিস্ময়কর। তবে এই বিস্ময়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে দেশের ফুটবলে বয়ে চলা এক নতুন বসন্তের হাওয়া। হামজা চৌধুরী কিংবা শমিত সোমদের মতো প্রবাসী নক্ষত্রদের আগমনে লাল-সবুজের ফুটবলে যে নবজাগরণের সুর বেজে উঠেছে, তার অনুরণন এখন ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক ফুটবলের সীমানায়।

দেশের ফুটবলের এই ক্রান্তিলগ্নে একটি বিষয় একেবারে স্পষ্ট, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ডাগআউটে একজন হাই-প্রোফাইল কোচের কোনো বিকল্প নেই। সদ্য বিদায়ী কোচ কাবরেরার কেবল উয়েফা প্রো লাইসেন্সই ছিল, কিন্তু বড় মঞ্চের অভিজ্ঞতা ছিল না বললেই চলে। ফলস্বরূপ, হামজা-সমিতদের মতো ইউরোপিয়ান আবহে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়রা দলে যুক্ত হওয়ার পরও মাঠের ফুটবলে তার কাঙ্ক্ষিত প্রতিফলন দেখা যায়নি।

বিপরীত চিত্রটি দেখা যায় দেশের নারী ফুটবলে। সেখানে পিটার বাটলারের মতো হাই-প্রোফাইল কোচের ছোঁয়ায় বদলে গেছে পুরো দৃশ্যপট। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ওয়েস্টহ্যাম ইউনাইটেডের মতো দলে খেলার সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা এবং কোচিংয়ের বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে তিনি যখন মেয়েদের দায়িত্ব নিলেন, তখন থেকেই শুরু হলো নতুন এক জাগরণ। মেয়েরা এখন শুধু সাফের গণ্ডিতেই আটকে নেই, তারা এশিয়ান কাপের মঞ্চেও দাপটের সাথে খেলছে।

বাটলারের এই সাফল্যই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ছেলেদের জাতীয় দলেও এখন এমন একজন অভিজ্ঞ ও হাই-প্রোফাইল ট্যাকটিশিয়ান প্রয়োজন। যিনি শুধু ড্রয়িংবোর্ডে ছক কষবেন না, বরং ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আসা খেলোয়াড়দের মানসিকতা বুঝবেন এবং দেশি খেলোয়াড়দের সাথে তাদের রসায়ন জমিয়ে তুলবেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো নামের তালিকাটি নজরকাড়া হলেও, এখনও কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেনি বাফুফে। তবে তারা 'দ্য ডেইলি স্টার'কে নিশ্চিত করেছে যে, জাতীয় দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বেশ কয়েকজন কোচ আবেদন করেছেন। এই তালিকায় জ্বলজ্বল করছে মালদ্বীপকে সাফ জেতানো ‘ক্রোয়েশিয়ান আইনস্টাইন’ খ্যাত পিটার সেগ্রেট এবং ভারতের জোড়া সাফজয়ী সাবেক কোচ ইগর স্টিমাচের নাম। পিছিয়ে নেই বসুন্ধরা কিংসের সাবেক রোমানিয়ান কোচ ভ্যালেরি তিতা কিংবা জার্মানির অ্যান্টেইন হেইয়ের মতো অভিজ্ঞরাও। এছাড়া মিওদ্রাগ রাদলোভিচ, দিদিয়ের ওলের মতো নামগুলোও আছে বাফুফের রাডারে আছে।

তবে হাই-প্রোফাইল কোচদের কাজের ধরন সাধারণ কোচদের মতো হয় না। তারা প্রথাগত অনুশীলনের গণ্ডিতে আটকে থাকেন না, বরং পুরো দল পরিচালনা করেন একজন আধুনিক ‘ম্যানেজার’ হিসেবে। তাদের কাজের প্রতিটি ধাপ হয় বিজ্ঞানভিত্তিক এবং নিখুঁত তথ্যনির্ভর। আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকিং, স্পোর্টস সায়েন্স, খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজতে নিবিড় ভিডিও অ্যানালাইসিসের ওপর প্রবল জোর দেন তারা।

আর একজন শীর্ষ মানের কোচ সাধারণত একা আসেন না। তিনি নিজের দর্শনের সাথে মানানসই একটি পূর্ণাঙ্গ সাপোর্ট স্টাফ বলয় দাবি করেন। যেখানে ট্যাকটিক্যাল অ্যানালিস্ট, ফিটনেস ট্রেইনার, নিউট্রিশনিস্ট থেকে শুরু করে গোলকিপিং কোচ পর্যন্ত সবাই একই ছকে কাজ করবেন। ড্রেসিংরুমে তারা চান নিরঙ্কুশ আধিপত্য, যেখানে ফেডারেশনের কর্তাদের কোনো ছায়া পড়বে না। এমন একজন মাস্টারমাইন্ডকে ডাগআউটে বসাতে হলে বাফুফেকেও কাঠামোগতভাবে প্রস্তুত হতে হবে। আধুনিক জিমনেসিয়াম, রিকভারি সুবিধা এবং স্বাধীনভাবে দল নির্বাচনের শতভাগ ক্ষমতা, এগুলো হাই-প্রোফাইল কোচদের প্রাথমিক শর্ত।

অবশ্য ফুটবলের এই হাই-প্রোফাইল ডামাডোলের মাঝে ভিন্ন মতও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শুধু বড় নাম নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। সাবেক তারকা ফুটবলার ও কোচ আলফাজ আহমেদ যেমনটা মনে করেন, ‘আমাদের আসলে এমন একজন কোচ প্রয়োজন যে কিনা আমাদের দলকে বুঝবে। এখন আমাদের অনেক প্রবাসী খেলোয়াড়ও আসছে। একজন কোচ রাতারাতি সব বদলে দিতে পারবে না, তাকে অন্তত ২-৩ বছরের জন্য দায়িত্ব দিতে হবে, যেন সে আগামী ৮-১০ বছর প্রতিনিধিত্ব করার মতো একটি ব্যাচ তৈরি করে দেয়।’

বাফুফেও ঠিক এমনই এক কারিগর খুঁজছে, যিনি শুধু ড্রয়িংবোর্ডে আটকে না থেকে তৃণমূলের ধুলোমাখা পথ ধরে জাতীয় দল পর্যন্ত একটি নিশ্ছিদ্র কাঠামো তৈরি করতে পারবেন। টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান হিল্টনের কথায় স্পষ্ট হলো সেই রূপকল্প, ‘আমরা এমন কাউকে চাই যিনি তৃণমূল থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২৩ এবং জাতীয় দল পর্যন্ত পুরো কাঠামো নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারবেন। আমরা মূলত এমন একজন কোচ খুঁজছি যিনি ছোট পর্যায় থেকে একটি দলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে জাতীয়, এএফসি বা বিশ্বকাপ পর্যায়ে ভালো ফলাফল এনে দিয়েছেন।’

একইসঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের বদলে যাওয়া ট্যাকটিক্যাল ট্রেন্ডের দিকেও নজর রাখছে ফেডারেশন। হিল্টন ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, এই নতুন যুগে ব্রাজিলিয়ান ঘরানার চেয়ে আর্জেন্টাইন কৌশলই বাংলাদেশের জন্য বেশি মানানসই হতে পারে। তার মতে, ‘ব্রাজিলিয়ান কোচিং ফরম্যাট এখন আর সেভাবে চলে না এবং বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন কোচদের বেশ ভালো আধিপত্য রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের দর্শকদের পছন্দের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।’

তবে দিনশেষে, হামজা-শমিতদের মতো খেলোয়াড়দের সামলানো এবং তাদের সেরাটা বের করে আনার জন্য একজন হেভিওয়েট কোচের উপস্থিতি ড্রেসিংরুমে যে মানসিক বুস্ট এনে দেয়, তার বিকল্প এই মুহূর্তে নেই। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটও আর বাফুফেকে তৃপ্ত করছে না। সাফ ফুটবলের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে তাদের দৃষ্টি এখন আরও দূর দিগন্তে।

আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বাছাই কমিটির ছাঁকনিতে উঠে আসবে ২৫-৩০ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা। কে হবেন সেই হাই-প্রোফাইল স্বপ্নসারথি, যিনি পিটার বাটলারের মতোই ছেলেদের ফুটবলে ভাঙবেন স্থবিরতার শিকল?