হঠাৎ বেকার হলে সম্পর্কে কেমন প্রভাব পড়ে?

অনিন্দিতা চৌধুরী
অনিন্দিতা চৌধুরী

‘অভাব যখন দরজা দিয়ে আসে, ভালোবাসা নাকি তখন জানলা খুলে পালিয়ে যায়’। বাস্তবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে বহু বছর ধরেই এই উক্তিটি বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে। কিন্তু এর সত্যতা কতটুকু? যদি একটি জুটির মধ্যে একজন তার ক্যারিয়ারে অনেক বেশি প্রতিকূলতার সামনে পড়ে যান, সেক্ষেত্রে অপর পক্ষ কতটা নির্ভরতা দিতে পারেন?

ছাঁটাইয়ের কারণে চাকরি হারানো, মানসিক চাপের ফলে নিজে থেকেই ছেড়ে দেওয়া বা অন্য ধরনের ক্যারিয়ার গড়া—এমন বহু কারণেই হঠাৎ বেকারত্বের মুখোমুখি হতে পারেন যে কেউ। এ অবস্থার প্রভাব নিজের মানসিক অবস্থার ওপর যেমন পড়ে, তেমনি ব্যক্তির পরিবার, তার আশপাশের ঘনিষ্ঠজনেরা এবং বিশেষত তার সঙ্গীটির ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। সেই প্রভাবগুলো কেমন এবং তা কাটিয়ে ওঠার কী উপায় আছে— আদৌ কোনো উপায় আছে কি না, সেসব নিয়েই কথা হবে।

অর্থনৈতিক সমস্যা

বেকারত্বের সবচেয়ে প্রধান প্রভাব অর্থনীতির দিক দিয়েই পড়ে। আর পরবর্তীতে সে প্রভাবের ডালপালা বিস্তার হয়ে অন্যদিকে ছড়ায়। অর্থনৈতিক সমস্যার ফলে আগের মতো বিভিন্ন জায়গায় খেতে যাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, এমনকি উপহার আদান-প্রদানেও ভাটা পড়ে। যা কিনা একধরনের অসন্তোষ তৈরির কারণ হতে পারে। বেশিরভাগ প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই দুজনের বিশেষ দিন মনে রাখা, সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করে উপহারে উপহারে ভরিয়ে দেওয়ার একটি সুন্দর ইচ্ছা থাকে। কিন্তু হঠাৎ বেকারত্বে যে অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে মানুষ পড়ে, সেখানে তার এই সুযোগগুলো থাকে না। তখন অর্থনৈতিক সমস্যাই অন্য সব সমস্যার সূত্রপাত করতে থাকে।

আবেগীয় টানাপোড়েন

বেকারত্বের একটি বড় প্রভাব হচ্ছে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। তাই সঙ্গীটিকে নিয়ে যেভাবে ভাবা হচ্ছিল সম্পর্কের পরের ধাপে, সেক্ষেত্রে হঠাৎ করে একটি ‘স্পিডব্রেকার’-এর আগমন ঘটে। আর তাই সম্পর্কের গাড়িও আগের মতো আরামসে চলতে পারে না। অপরপক্ষের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ে এবং সে সময়ে সম্পর্ক নিয়ে একইভাবে ভাবার সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে অনেকক্ষেত্রেই।

মানসিক দূরত্ব

আর এই চলমান আবেগীয় টানাপোড়েন থেকে একসময় জন্ম নেয় মানসিক দূরত্ব। একজন যখন জীবনে আসা আচমকা এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন অন্য পক্ষ হয়তো সবসময় সেটি বুঝে উঠতে পারে না। ফলে তার চাওয়া-পাওয়ার গ্রাফটা আগের মতোই ঊর্ধ্বগামী হতে থাকে, আর মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তিটি কোনো ধরনের প্রত্যাশাই পূরণ করতে ব্যর্থ বোধ করে। এই ব্যর্থতাবোধ ও প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া মিলে যা তৈরি হয়, তা হচ্ছে দুজনের মধ্যকার মানসিক দূরত্ব। একে অন্যকে তখন আর মন খুলে কিছু বলা যায় না, মনে হয়—‘ও তো বুঝবে না। থাক, বলার দরকার নেই’। না বলতে বলতেই জমতে থাকে এক অদৃশ্য শ্যাওলাঘেরা প্রাচীর। যত সময় যায়, সে প্রাচীর ডিঙোনো দুজনের পক্ষেই আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

সমাধান কী?

সম্পর্কজনিত যেকোনো সমস্যার দুটো সমাধান থাকে। হয়, সেটি থেকে সরে আসা—যা কিনা সবচেয়ে পরের ধাপ। অর্থাৎ চেষ্টা করে দু পক্ষ থেকেই কোনো সুরাহায় পৌঁছাতে না পারলে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে এর আগের ধাপ হচ্ছে ‘যোগাযোগ’। এই যোগাযোগ মানে দোষারোপ নয়, উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা কিংবা নীরব থেকে দেখে যাওয়াও নয়। এ যোগাযোগের অর্থ হচ্ছে ঠাণ্ডা মাথায় বসে এই সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলা, দুজনে মিলে চেষ্টা করা—নতুন বাস্তবতায় কীভাবে সম্পর্কটিকেও সুস্থ রেখে নিজেদের জীবনে এগিয়ে যাওয়া যায়।

ক্যারিয়ার জীবনের একটি বড় অংশ। কিন্তু ক্যারিয়ারে প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি হলে সেটির নেতিবাচক প্রভাব যাতে ব্যক্তিজীবনে যথাসাধ্য কম পড়ে, সেজন্য সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগটা স্পষ্ট রাখতে হবে। কোনোভাবেই অস্পষ্টতা আসতে দেওয়া যাবে না।

একটি সম্পর্কের ভিত্তি যদি সবল হয়, তবে কোনো প্রতিকূলতাই তাকে নাড়াতে পারে না। বরং জীবনে আসা এমন আচমকা হতাশাগুলো একে অন্যকে আরও কাছে এনে দিতে পারে, যদি দুজনের মধ্যে একাত্মতা ও বিশ্বাসের ভিতটা শক্ত থাকে।